অর্থনীতি

ডিজিটালের তুলনায় নগদ লেনদেনে ব্যয় ২৮ গুণ বেশি: বাংলাদেশ ব্যাংক


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম

ডিজিটালের তুলনায় নগদ লেনদেনে ব্যয় ২৮ গুণ বেশি: বাংলাদেশ ব্যাংক
ছবি: সংগৃহীত

নগদ লেনদেনের তুলনায় ডিজিটাল লেনদেনে ব্যয় প্রায় ২৮ গুণ কম। নগদ অর্থের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, নিরাপত্তা ও ব্যাংক নোট ছাপানোর পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। অন্যদিকে, ডিজিটাল লেনদেনে তুলনামূলকভাবে অনেক কম খরচে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘দ্য কস্ট অব ক্যাশ স্টাডি ইন বাংলাদেশ: আ কম্পারেটিভ অ্যানালাইসিস অব ক্যাশ অ্যান্ড ডিজিটাল পেমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় নগদ ও ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয়ের এই চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে নগদ লেনদেনের বার্ষিক ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা ওই বছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। বিপরীতে, ডিজিটাল লেনদেনের বার্ষিক ব্যয় ছিল প্রায় ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ।

গবেষণায় মাথাপিছু ব্যয়ের হিসাবেও নগদ ও ডিজিটাল লেনদেনের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা গেছে। এতে বলা হয়েছে, বছরে মাথাপিছু নগদ লেনদেনের ব্যয় প্রায় ৯ হাজার ৯৩৮ টাকা। অন্যদিকে, ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে এই ব্যয় মাত্র ৩৪৮ টাকা। অর্থাৎ নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো গেলে ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সামগ্রিক অর্থনীতির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ব্যয় জড়িত। ব্যাংক নোট ছাপানোর জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি, নোট ছাপানো, পরিবহন এবং বাজারে নগদ অর্থের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়মিত ব্যয় করতে হয়।

তিনি বলেন, ব্যবহারের ফলে ব্যাংক নোট পুরোনো, ছেঁড়া ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। তখন সেগুলোর পরিবর্তে নতুন নোট ছাপাতে হয়। এ কারণে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় বারবার ব্যয় তৈরি হয়। ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়ানো গেলে এসব ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকায় আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং দুর্নীতি, চুরি ও অর্থের অপব্যবহার কমাতেও সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলোর ব্যয়ের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, নগদ লেনদেন পরিচালনা করতে ব্যাংকগুলোকে বছরে প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ। এ ছাড়া ভোক্তাদের নগদ লেনদেনসংক্রান্ত বার্ষিক ব্যয় প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।

নগদ লেনদেনের ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক নোট ছাপানো ও বিতরণ, অর্থ পরিবহন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথ পরিচালনা এবং টাকা তোলা, বহন ও ব্যবহারের জন্য মানুষের ব্যয় করা সময়ের মূল্য। এসব কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ ব্যয়ের পাশাপাশি পরোক্ষ ব্যয়ও যুক্ত হয়, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

গবেষণায় নগদ অর্থের ব্যবহার ও ছায়া অর্থনীতির কারণে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব হারানোর বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ছায়া অর্থনীতির কারণে বছরে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এই পরিমাণ অর্থ জিডিপির ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং নগদ লেনদেনের মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৭৬ শতাংশের সমান। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ছায়া অর্থনীতির কারণে রাজস্ব হারানোর বিষয়টি হিসাবের বাইরে রাখলেও নগদ লেনদেনের ব্যয় ডিজিটাল লেনদেনের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি।

তবে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হলেও এই ব্যবস্থার আর্থিক ও পরিচালনাগত কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় বছরে আনুমানিক ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আয় হয়। বিপরীতে, এ ব্যবস্থার পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় ও আয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণায় ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণের পথে কয়েকটি প্রধান বাধা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া বেশি মাশুল, লেনদেনের অর্থ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তসংযোগের সীমাবদ্ধতা এবং ইন্টারনেট সংযোগের অনির্ভরযোগ্যতা। এসব সমস্যার কারণে অনেক ব্যবসায়ী ডিজিটাল লেনদেন গ্রহণে আগ্রহ হারান। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে লেনদেনের অতিরিক্ত মাশুল মুনাফার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ছাড়া ডিজিটাল লেনদেনে প্রতারণা, লেনদেন ব্যর্থ হওয়া, ভুল হিসাবে টাকা চলে যাওয়া এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমিত দক্ষতার বিষয়গুলোও গ্রাহকদের আস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। অনেক ভোক্তা ও ব্যবসায়ী ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। এ কারণে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়াতে নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর প্রক্রিয়া গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে গবেষণাটি।

নগদ ও ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জ মূল্যায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় ডেস্কভিত্তিক পর্যালোচনা, পেমেন্ট ব্যবস্থার তথ্য ও নীতিমালা বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ২১টি সাক্ষাৎকার এবং পাঁচটি দলভিত্তিক আলোচনা পরিচালনা করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেশের লেনদেন ব্যবস্থায় নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল আর্থিক সেবা ও ইলেকট্রনিক অর্থ স্থানান্তরের প্রসার ঘটলেও দেশের লেনদেন ব্যবস্থায় নগদ অর্থের আধিপত্য এখনো বজায় রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের লেনদেনের মোট সংখ্যার ৮০ শতাংশের বেশি এখনো নগদে সম্পন্ন হয়। ফলে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তার ঘটলেও দৈনন্দিন কেনাকাটা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নগদ অর্থের ব্যবহার কমাতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল লেনদেনের খরচ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের অনেকের মুনাফার পরিমাণ সীমিত। এ অবস্থায় ডিজিটাল পেমেন্টের জন্য অতিরিক্ত মাশুল দিতে হলে ব্যবসার লাভ আরও কমে যেতে পারে। তাই ডিজিটাল লেনদেনের ফি, অর্থ নিষ্পত্তির সময় এবং সংশ্লিষ্ট খরচ সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের কাছে স্বচ্ছ ও সহজবোধ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

অন্যদিকে, ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে ভোক্তারা সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের পাশাপাশি লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণের সুবিধা পান। এতে আর্থিক কার্যক্রমের হিসাব রাখা সহজ হয় এবং প্রয়োজনে লেনদেনের প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়। তবে এসব সুবিধা কাজে লাগাতে ডিজিটাল সেবাকে সহজে ব্যবহারযোগ্য, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে হবে। পাশাপাশি প্রতারণা থেকে গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি।

ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ঘটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তসংযোগযোগ্য পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগের অংশ হিসেবে জাতীয় মানদণ্ড হিসেবে ‘বাংলা কিউআর’ চালু করেছে। ব্যবসায়ীদের কাছে এই ব্যবস্থা আরও আকর্ষণীয় করতে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি শূন্য শতাংশ নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই উদ্যোগের লক্ষ্য কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের খরচ কমানো।

তবে বাংলা কিউআরসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের কাছে এসব সেবা কতটা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠছে তার ওপর। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তসংযোগ বাড়ানো, লেনদেনের অর্থ দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং ইন্টারনেট সংযোগের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণের জন্য শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুললেই হবে না; একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা উন্নয়ন এবং গ্রাহক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। নগদ অর্থের পরিবর্তে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারের সুবিধা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি লেনদেনসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় উঠে এসেছে, নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ব্যয় সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ইলেকট্রনিক লেনদেনের রেকর্ড আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি আরও কার্যকর করতে সহায়তা করতে পারে।

তবে এই পরিবর্তন বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ডিজিটাল লেনদেনের খরচ কমানো, গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তসংযোগ বাড়ানো এবং অর্থ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব দূর করার পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারে মানুষের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও সাশ্রয়ী, স্বচ্ছ ও দক্ষ করে তোলা সম্ভব হবে।