বিজ্ঞান-তথ্যপ্রযুক্তি
সেলফি বিশ্লেষণ করেই ক্যান্সার রোগীর বেঁচে থাকার পূর্বাভাস দেবে এআই
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সাহায্যে এবার মুখের একটি ছবি বা সেলফি বিশ্লেষণ করেই ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে পূর্বাভাস পাওয়ার নতুন পথ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একদল চিকিৎসক ও গবেষকের উদ্ভাবিত এআই প্রযুক্তি মুখমণ্ডলের গঠন বিশ্লেষণ করে ব্যক্তির জৈবিক বয়স অনুমান করতে পারে। পাশাপাশি, ক্যানসার রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি মূল্যায়নেও এটি সহায়ক হতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। তবে এই প্রযুক্তি কোনো রোগীর মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময় বলে দিতে পারে না; বরং বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সমন্বিত একাডেমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান মাস জেনারেল ব্রিগাম-এর গবেষকরা বিশেষভাবে এই এআই মডেল তৈরি করেছেন। এ-সংক্রান্ত গবেষণা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেট ডিজিটাল হেলথ-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা পরিকল্পনা, শারীরিক সক্ষমতা মূল্যায়ন এবং চিকিৎসার ঝুঁকি নির্ধারণে চিকিৎসকদের সহায়তা করতে পারে।
গবেষণায় ব্যবহৃত এআই মডেলটি বিভিন্ন বয়স ও জনগোষ্ঠীর মানুষের চার কোটিরও বেশি মুখের ছবি বিশ্লেষণ করে প্রশিক্ষণ পেয়েছে। এই বিশাল তথ্যভান্ডার কাজে লাগিয়ে তৈরি মূল মডেল থেকে গবেষকরা দুটি পৃথক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এগুলো হলো ‘ফাহর-ফেসএজ’ (FAHR-FaceAge) এবং ‘ফাহর-ফেসসারভাইভাল’ (FAHR-FaceSurvival)। প্রথম প্রযুক্তিটি মুখের ছবি বিশ্লেষণ করে ব্যক্তির বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে জৈবিক বয়স অনুমান করে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় প্রযুক্তিটি মুখের ছবি থেকে সরাসরি ক্যানসার রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ও মৃত্যুঝুঁকি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষের প্রকৃত বয়স এবং চেহারা দেখে অনুমান করা বয়সের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। কারও বয়স ৫০ বছর হলেও তাঁকে দেখতে ৫৫ বা ৬০ বছরের মানুষের মতো মনে হতে পারে। আবার কারও চেহারায় বয়সের ছাপ তুলনামূলক কম থাকতে পারে। এআই মডেলটি মুখমণ্ডলের বিভিন্ন সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে এই পার্থক্য নির্ণয় করে। এর মাধ্যমে ব্যক্তির জৈবিক বয়স সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, যা তাঁর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসা সহ্য করার সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দুটি প্রযুক্তি মুখের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করে। ফাহর-ফেসএজ মুখের বিভিন্ন ভাঁজ ও গঠনের পাশাপাশি নাকের দুই পাশ থেকে ঠোঁটের কোণ পর্যন্ত বিস্তৃত রেখা, চোখের ওপরের অংশ এবং কপাল ও কানের পাশের ত্বকের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে। অন্যদিকে, ফাহর-ফেসসারভাইভাল চোখের নিচের অংশ এবং নাকের ওপরের গঠনসহ মুখমণ্ডলের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারণের চেষ্টা করে।
গবেষণার সহ-জ্যেষ্ঠ লেখক হুগো আর্টস জানিয়েছেন, সাধারণ মুখের ছবি থেকে ক্যানসার রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে সরাসরি পূর্বাভাস দেওয়ার এই পদ্ধতি চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তাঁর মতে, বিপুলসংখ্যক মুখের ছবি বিশ্লেষণ করে প্রশিক্ষিত একটি ভিত্তিমডেলকে কাজে লাগিয়ে জৈবিক বয়স ও রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনার মতো জটিল বিষয় মূল্যায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা করে নতুন মডেল তৈরির পরিবর্তে একটি শক্তিশালী ভিত্তিমডেলকে বিভিন্ন চিকিৎসাবিষয়ক কাজে ব্যবহার করা গেলে নতুন নতুন বায়োমার্কার শনাক্ত করার সুযোগও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে রেডিওথেরাপি নেওয়া ক্যানসার রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু ফলাফল পেয়েছেন। ফাহর-ফেসএজ প্রযুক্তির পূর্বাভাস অনুযায়ী, যেসব রোগীকে তাঁদের প্রকৃত বয়সের তুলনায় অন্তত পাঁচ বছর বেশি বয়স্ক দেখাচ্ছিল, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। গবেষণার গড়ে চার বছরের পর্যবেক্ষণকালীন সময়ে এই রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি অন্য রোগীদের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়। বিপরীতে, যেসব রোগীকে তাঁদের প্রকৃত বয়সের তুলনায় অন্তত পাঁচ বছর কম বয়স্ক দেখাচ্ছিল, তাঁদের ক্যানসার-সম্পর্কিত মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ১৭ শতাংশ কম ছিল।
গবেষকদের মতে, এসব ফলাফল থেকে বোঝা যায়, বাহ্যিক চেহারায় প্রকাশ পাওয়া বয়সের ছাপ মানুষের অভ্যন্তরীণ শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে ক্যানসারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসা নেওয়ার সময় রোগীর শারীরিক সক্ষমতা, সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা এবং চিকিৎসার ধকল সহ্য করার ক্ষমতা মূল্যায়নে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে গবেষণায় পাওয়া ঝুঁকির পার্থক্যকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা বা মৃত্যুর সময় নির্ধারণের উপায় হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
মাস জেনারেল ব্রিগামের রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট ড. রেমন্ড মাক বলেন, মানুষের গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকদের জন্য রোগীর প্রকৃত শারীরিক সক্ষমতা নির্ধারণ করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রেডিওথেরাপি, জটিল অস্ত্রোপচার কিংবা অন্যান্য কঠিন চিকিৎসা শুরু করার আগে রোগী কতটা ধকল সহ্য করতে পারবেন, তা জানা প্রয়োজন। তাঁর মতে, মুখের ছবি বিশ্লেষণকারী এআই প্রযুক্তি রোগীর শারীরিক অবস্থা মূল্যায়নে একটি পরিমাপযোগ্য পদ্ধতি তৈরি করতে পারে। এর ফলে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও তথ্যনির্ভর হতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা ও পেশাগত সিদ্ধান্তের বিকল্প নয়; বরং সহায়ক উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্যেই এটি তৈরি করা হয়েছে।
গবেষণায় জীবনযাপনের কিছু অভ্যাসের সঙ্গে চেহারায় অকালবার্ধক্যের সম্পর্কও উঠে এসেছে। এআই মডেলের বিশ্লেষণে অতিরিক্ত মদ্যপান, মাদক সেবন ও ধূমপানের মতো অভ্যাসের সঙ্গে তুলনামূলক বেশি বয়সী দেখানোর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করেও ফাহর-ফেসএজ মডেলটি বেশ ধারাবাহিক ফলাফল দিয়েছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। ভিন্ন আলো, মুখের অভিব্যক্তি, ছবির পোজ এবং মেকআপের মতো বিষয় থাকা সত্ত্বেও মডেলটির কার্যকারিতা বজায় ছিল। সাধারণ কিছু প্লাস্টিক সার্জারির পরও ফলাফলে বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি, যদিও নাকের আকৃতি পরিবর্তনের অস্ত্রোপচার বা রাইনোপ্লাস্টির ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা হয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা থাকলেও এর ব্যবহার নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা। তাঁদের মতে, হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে ব্যাপকভাবে প্রয়োগের আগে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, বয়স এবং ক্যানসারের ধরনভেদে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিটির পূর্বাভাস কতটা নির্ভুল, বাস্তব চিকিৎসায় এর ফলাফল কতটা কার্যকর এবং ভুল পূর্বাভাস রোগীর চিকিৎসায় কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সেসব বিষয়ও বিস্তারিতভাবে যাচাই করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, সেলফি বিশ্লেষণ করে ক্যানসার রোগীর সম্ভাব্য মৃত্যুঝুঁকি নির্ধারণের এই এআই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এটি এখনই রোগীর আয়ু নির্ধারণের নিশ্চিত পদ্ধতি নয়। বরং চিকিৎসকের মূল্যায়নের সঙ্গে ব্যবহার করা গেলে রোগীর শারীরিক অবস্থা বুঝতে এবং উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়ক একটি প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে।