অর্থনীতি
নগদ বিক্রির উদ্যোগ থেকে সরে দাঁড়ালেন গভর্নর
বেসরকারিখাতের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান নগদ–কে ঘিরে দীর্ঘদিনের তৎপরতার পর বিক্রির উদ্যোগ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। সংশ্লিষ্টদের মতে, দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই গভর্নর নগদ ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেন। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক নিয়োগ, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, একাধিক অডিট এবং উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে নজিরবিহীন তৎপরতা দেখা যায়। এমনকি নগদকে বিকাশ–এর মতো একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও তিনি প্রকাশ্যে জানান।
এক পর্যায়ে নগদের অনুমোদন বাতিলের দাবিতে অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করেন গভর্নর। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগীদের নিজস্ব পছন্দের এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের নির্দেশনাও জারি হয়, যা কার্যত নগদকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা বলে অভিযোগ ওঠে।
তবে এসব উদ্যোগের পরও নগদের কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। মালিকানা বা কাঠামোগত সংস্কার দৃশ্যমান না হওয়ায় গভর্নরের অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময় পর্যন্তও তিনি বিক্রির পথ খুঁজছিলেন বলে জানা যায়।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান–এর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন গভর্নর। গত ৮ ফেব্রুয়ারি আরমান নগদ অধিগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করে গভর্নরের কাছে চিঠি দেন। সম্ভাব্য বিনিয়োগের আগে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও পরিচালন অবস্থা মূল্যায়নে অডিটের অনুমতি চান তিনি। চিঠিতে তিনি দেশি-বিদেশি বহুজাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করার কথাও উল্লেখ করেন এবং একটি ডিজিটাল ব্যাংক গড়ার পরিকল্পনার কথা জানান।
আরমান দাবি করেন, বৈঠকে তাকে জানানো হয় যে পূর্ববর্তী সরকারের সময়ের কথিত অনিয়মের কারণে নগদ বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসনের অধীনে রয়েছে এবং যাচাই-বাছাই শেষে নতুন মালিকানায় হস্তান্তরের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি একটি ফরেনসিক অডিটের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আরমান প্রায় আট বছর জোরপূর্বক গুম ছিলেন। ২০১৬ সালে মিরপুর থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয় এবং ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট তিনি মুক্তি পান। দীর্ঘ সময় গুম থাকার পর বড় অঙ্কের বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করায় অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক।
এদিকে গত ১১ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট–এর চেম্বার জজ আদালতের বিচারপতি মো. রেজাউল হক আদেশ দেন, নগদে প্রশাসক নিয়োগের বৈধতা সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
তবুও বিক্রির প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। তবে শেষ পর্যন্ত এক ইংরেজি দৈনিককে দেওয়া বক্তব্যে গভর্নর জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য ছিল নগদকে পুনরায় বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু নতুন সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা তাদের বিষয়। তিনি বলেন, নগদ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠান নয়; বর্তমানে এটি সরকারের মালিকানাধীন, সিদ্ধান্তও সরকারকেই নিতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগদের এক কর্মকর্তা বলেন, বিক্রির সিদ্ধান্ত এককভাবে গভর্নর নিতে পারেন না। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন এবং মালিকানা কাঠামো জটিল—সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডাক বিভাগ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক—এই তিন পক্ষের সম্মতি ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে দেড় বছরের নানা উদ্যোগের পর নগদ বিক্রির প্রচেষ্টা থেমে গেছে, তবে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ও কাঠামো নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে, তা এখনও অনিশ্চিত।