ফিচার

বাবার কবর জিয়ারতের হৃদয়ছোঁয়া ছবি পেল সেরা আলোকচিত্রের পুরস্কার


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম

বাবার কবর জিয়ারতের হৃদয়ছোঁয়া ছবি পেল সেরা আলোকচিত্রের পুরস্কার
ছবি: সংগৃহীত

সমুদ্রের ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল বাবার কবর। হয়তো আর কিছুক্ষণ পরই মাটির সঙ্গে মিশে যাবে শেষ স্মৃতিচিহ্নটি। তাই কবরটি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো জিয়ারত করছিলেন এক ছেলে। বাবার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছেলের হৃদয়ছোঁয়া মুহূর্তটি ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন আলোকচিত্রী ডা. ইমরান পারভেজ। জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরা সেই ছবিই পেয়েছে সেরা আলোকচিত্রের পুরস্কার।

রাজধানীর জাতীয় শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালায় সমুদ্র ও উপকূলের আলোকচিত্র নিয়ে আয়োজিত ‘ওয়েভস অব লাইফ’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে ছবিটি প্রদর্শিত হয়। গত ১৮ অক্টোবর শুরু হওয়া পাঁচ দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীতে ছবিটি দর্শনার্থীদের আবেগাপ্লুত করে। দর্শকদের ভোট ও বিচারকমণ্ডলীর মূল্যায়নে ছবিটি প্রতিযোগিতার সেরা আলোকচিত্র নির্বাচিত হয়।

ছবিটি দেখে অনেক দর্শনার্থী প্রশ্ন তুলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ পেলেও মানুষের পূর্বপুরুষদের শেষ স্মৃতিচিহ্ন, অর্থাৎ কবর হারানোর ক্ষতি কীভাবে পূরণ হবে? ছবিটি অসংখ্য দর্শনার্থীর হৃদয় ছুঁয়েছে।

ছবিটির আলোকচিত্রী ভেটেরিনারি চিকিৎসক ডা. ইমরান পারভেজ বাংলাভিশনকে বলেন, ছবিটি সম্ভবত ২০২১ বা ২০২২ সালের। সে সময় তিনি ভাষানচরে রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করতেন। যাতায়াতের পথে বিভিন্ন দৃশ্যের ছবি তুলতেন তিনি।

ইমরান পারভেজ জানান, একদিন ভাষানচরে যাওয়ার পথে নোয়াখালীর জনতাঘাট এলাকায় ছবি তুলছিলেন তিনি। তখন সমুদ্রের ভাঙনে বিলীন হতে থাকা একটি কবরস্থান তার চোখে পড়ে। সেখানে অনেকগুলো কবর ছিল। ধীরে ধীরে সেগুলো সমুদ্রে হারিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় সমুদ্রের দিকে দাঁড়িয়ে এক ছেলেকে বাবার কবর জিয়ারত করতে দেখেন তিনি। কবরটির শেষ অংশ তখনো মাটির সঙ্গে যুক্ত ছিল। হয়তো আর কিছুক্ষণ পরই সেটিও বিলীন হয়ে যেত।

ঘটনাটি বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই আলোকচিত্রী। তিনি বলেন, শুধু ওই কবরটিই নয়, পরবর্তী সময়ে সেখানকার পুরো কবরস্থান সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। এমনকি সেই ঘাটটিও এখন আর নেই। সমুদ্রের ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে গেছে।

ছবিটি দেখে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলোর বোধোদয় হলে বাংলাদেশ হয়তো কোনো একসময় ক্ষয়ক্ষতি তহবিল থেকে সহায়তা পেতে পারে। কিন্তু বাবার কবর হারানোর ক্ষতিপূরণ কীভাবে দেওয়া সম্ভব? কোটি টাকা পেলেও কেউ কি নিজের বাবার কবর বিক্রি করবেন?

আতিকুল ইসলাম নামে এক দর্শনার্থী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ কত মূল্যবান সম্পদ হারাচ্ছে, যার ক্ষতি অর্থনৈতিক মূল্য দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়, ছবিটি তারই প্রমাণ। তার মতে, ছবিটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত, যাতে মানুষ বুঝতে পারে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ শুধু অর্থনৈতিক ও শারীরিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিক থেকেও অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ছে।

রাজধানীর জাতীয় শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালায় আয়োজিত এ আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীতে নদী, সাগর, জলজ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার নানা চিত্র তুলে ধরা হয়। ‘ওয়েভস অব লাইফ’ শীর্ষক পাঁচ দিনব্যাপী এ আয়োজন করে ইয়ুথ ফর ওশান, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ এবং মিশন গ্রিন বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে প্রদর্শনীর সমাপ্তি হয়।

প্রদর্শনীতে তরুণ আলোকচিত্রীদের ক্যামেরায় ধারণ করা প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের নানা চিত্র স্থান পায়। আলোকচিত্রের মাধ্যমে জলজ বাস্তুতন্ত্রের সংকট, জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ওপর সৃষ্ট প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হয়।

প্রতিযোগিতায় জলজ জীবিকা ও উপকূলীয় দূষণ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হন ইমরান পারভেজ। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হন সাঈদ আব্বাস এবং জ্বালানি ও পরিবেশ বিভাগে পুরস্কৃত হন রাজীব রাইহান। এ ছাড়া তিনটি বিভাগে রানারআপ হিসেবে পুরস্কার পান মোহাম্মদ আমদাদ হোসাইন, মোহাম্মদ তাহিদুল ইসলাম ও আয়মান নাকিব। বিশেষ স্বীকৃতি পান জাকির হোসাইন, গালীব রহমান নাদিম, মোহাম্মদ শাহজাহান ও আয়মান নাকিব।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম বলেন, বাংলাদেশ নদীমাতৃক ও সমুদ্রবেষ্টিত দেশ। বঙ্গোপসাগর, উপকূলীয় অঞ্চল, নদনদী ও জলাভূমি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এসব সম্পদ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং অসংখ্য মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। তবে প্লাস্টিক ও বর্জ্যদূষণ, অপরিকল্পিত সম্পদ আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এসব প্রাকৃতিক প্রতিবেশ নানা সংকটের মুখে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।

আলোকচিত্রের গুরুত্ব তুলে ধরে ফরিদা খানম বলেন, অনেক সময় দীর্ঘ বক্তব্য যে বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না, একটি ছবি মুহূর্তেই মানুষের হৃদয় ও বিবেককে নাড়া দিতে পারে। পরিবেশবিষয়ক আলোকচিত্র প্রকৃতির সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং দূষণের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই আলোকচিত্র ধারণ ও উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সত্যনিষ্ঠা, যথাযথ প্রেক্ষাপট এবং পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখা জরুরি।

ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা সংগঠনের সদস্য সচিব এবং ইয়ুথ ফর ওশানের উপদেষ্টা শরীফ জামিলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক।

এ সময় আরও বক্তব্য দেন সার্ক কৃষি কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি কর্মকর্তা আবুল বাশার মিরাজ, মেরিন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক ও মিশন গ্রিন বাংলাদেশের পরিচালক কেফায়েত শাকিল, জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ আবু সাঈদ, মাকজিওন লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, সামুদ্রিক অনুসন্ধানকারী ও সেভ আওয়ার সি-এর পরিচালক সুফি মো. আতিকুর রহমান, আলোকচিত্রী সাঈদ আব্বাস ও আয়মান নাকিবসহ অনেকে।

বক্তারা বলেন, ‘ওয়েভস অব লাইফ’ শুধু একটি আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী নয়, বরং তরুণদের সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে নতুনভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ধরনের উদ্যোগ তরুণ প্রজন্মকে নদী, সাগর ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও সক্রিয় হতে উৎসাহিত করবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের দেড় শতাধিক আলোকচিত্রী তিনটি বিভাগে প্রায় ৬০০টি ছবি জমা দেন। সেখান থেকে বিচারকদের মূল্যায়নে সেরা ১০৫টি ছবি প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হয়। প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আলোকচিত্রী ও আলোকচিত্র শিক্ষাবিদ আবির আবদুল্লাহ, জার্মানির হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত সমুদ্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মফিজ রহমান এবং ধরিত্রী রক্ষায় আমরা সংগঠনের সদস্য ও রিভার বাংলার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ।