শীতের শুরুতেই নিউমোনিয়ার ঝুঁকিতে শিশু-বৃদ্ধ

২৪ নভেম্বর ২০২২, ১১:২১ এএম | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০৬:০৫ পিএম


শীতের শুরুতেই নিউমোনিয়ার ঝুঁকিতে শিশু-বৃদ্ধ

শীত আসতেই দেখা দেয় শীতজনিত নানা রোগ। যার বেশিরভাগ শিকার হচ্ছেন বয়স্ক লোকজন এবং শিশুরা। বিশেষ করে শীত মৌসুমের শুরুতেই নিউমোনিয়া ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, শীতের সময় অন্য রোগের তুলনায় বয়স্ক ও শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে বেশি। বিশেষ করে এই রোগ থেকে সর্তক না থাকলে এর প্রবণতা বাড়ে। আছে মৃত্যু ঝুঁকিও। সেই জন্য শিশু ও বয়স্কদের যত্নে রাখা দরকার।

চিকিৎসকরা বলছেন, নিউমোনিয়া হল ফুসফুসের সংক্রমণজনিত একটি ব্যাধি। এই রোগে ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে বুকে পানি জমতে পারে। সাধারণত ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাসের সংক্রমণে নিউমোনিয়া হয়। যেমন, স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনি নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ নিউমোনিয়া রোগের একটি অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া, ছত্রাকঘটিত কারণেও অনেক সময় নিউমোনিয়া হতে পারে।

চিকিৎসকদের দাবি, শীতের এ সময়টাতে বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সী বাচ্চার মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। সময়মতো এর চিকিৎসা না নিলে এই রোগ থেকে বাঁচার সম্ভাবনা কমে যায়।

সম্প্রতি রাজধানীর বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত বৃদ্ধ ও শিশুদের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, চলতি বছর ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দুই হাজার ৪৩৪ জন নিউমোনিয়া রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৬, ফেব্রুয়ারিতে ২১৬, মার্চে ৩৩০, এপ্রিলে ২২৬, মে’তে ২৫০, জুনে ২১৫, জুলাইয়ে ১৬৯, আগস্টে ১৮০, সেপ্টেম্বরে ১৭০, অক্টোবরে সবচেয়ে বেশি ৩০৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া চলতি মাসের ১০ দিনে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছেন ৮৪ জন।

গত বছর নিউমোনিয়ায় চিকিৎসা নিতে দুই হাজার ২২৭ শিশু এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। তাদের তথ্যমতে, গত চার মাসে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিভিন্ন সরকারি শিশু হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবর ও ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত শুধু ঢাকার সরকারি হাসপাতালে প্রায় ছয় হাজারেরও বেশি শিশু ও বয়স্করা এই রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

জানতে চাইলে ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালের চিকিৎসক ফারহানা বলেন, শীতের সময় সতর্ক না থাকলে সাধারণ মানুষ অনেক রোগে আক্রান্ত হয়। তবে আমরা যেটা দেখেছি শিশু, বৃদ্ধ ও বাচ্চার মায়েরা এসময়টাতে বেশির ভাগ নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়। শিশুর মায়েরা এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণ হিসেবে দেখা গেছে, খুব ছোট বাচ্চারা একটু টয়লেট বেশি করে এবং মায়েরা সকালে উঠে সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকেন। যেমন, রান্নার কাজ করেন, সেই ক্ষেত্রে তারা নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয়। আর শিশু ও বৃদ্ধরা যারা নিজেরা একাএকা চলাচল করতে পারে না তারা অনেক সময় অতিরিক্ত ঠাণ্ডার কারণে এই রোগে অক্রান্ত হয়।

শীতের এই মৌসুমে সবাই যদি একটু সর্তক হয়ে কাজকর্ম করেন তাহলে অনেক মানুষ এই রোগ থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন বলে জানান এই চিকিৎসক।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতের সময়ে দেশে প্রতি হাজারে প্রায় ৫০০ জন শিশু ও বয়স্করা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। প্রতিদিন গড়ে ৬৮ জন ও বছরে ২৪ হাজার ৮২০ শিশু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।

জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. সুমন ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, বিশেষ করে এই শীতের সময় নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করতে হলে— টিকা, স্বাস্থ্যকর জীবন ও পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা এবং সর্তক হওয়া খুবই জরুরি। প্রথমে কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ভেঙে না পড়া, এ সব বিষয় নিউমোনিয়ায় অনেকটা প্রতিরোধ হিসাবে কাজ করবে। বর্তমানে আমাদের দেশে উন্নত চিকিৎসা হচ্ছে। জেলা উপজেলায় সরকারি হাসপাতাল রয়েছে সেখানে এ সব রোগের চিকিৎসা হচ্ছে।

তিনি বলেন, নিউমোনিয়া শুধু শিশু বা বৃদ্ধদের হয় বিষয়টি এমন না, এই রোগে যে কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। তাই এ মৌসুমে সবাই একটু সচেতনতা বৃদ্ধি করে চলাফেরা করলে এই রোগ থেকে বাঁচা সম্ভব।

জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরা শামসাদ বলেন, নিউমোনিয়া রোগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা নেই বললেই চলে। এই রোগে আক্রান্ত হলে যেসব রোগী ও অভিভাবকেরা যথা সময়ে হাসপাতালে যান না পরর্বতী সময়ে তারা বিভিন্ন সংকটে পড়েন।

তিনি বলেন, বিশেষ করে বায়ু দূষণ, শীত ও প্রান্তিক পর্যায়ে রোগীদের অসচেতনার কারণে এই রোগে মানুষ বেশি আক্তান্ত হয়। তিনি বলেন, তবে শীতের সময় নিউমোনিয়া বাড়ে এবং এই রোগে সব চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশু বয়স্করা। এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের বাড়তি যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

আইসিডিডিআরবি’র মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, শীতের সময় নিউমোনিয়া মোকাবিলায় সবাইকে শারীরিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশে এক লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হতে পারে। তারা বলছে, গত বছর বাংলাদেশে এই রোগে প্রতি ঘণ্টায় একটি করে শিশু মারা গেছে। এবার শীত মৌসুমে সর্তক না হলে বেশি শিশু বা বয়স্ক মানুষ মারা যেতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকিসৎসক মো. সাখায়াত হোসেন বলেন, নিউমোনিয়া টিকা কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত রয়েছে। তার কারণ হলো করোনার সময় সবাই করোনার টিকা নিয়েছে কেউ নিউমোনিয়া নিয়ে চিন্তা করেনি। এখন শীতের সময় সব শিশুদের এই টিকা কার্যক্রম চলমান রাখা উচিত। শিশু ও বয়স্কদের পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত খাওয়াতে হবে। বেশ কিছু নির্দেশনা মেনে চললে এবং এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে এটি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

এনএইচবি/আরএ/