জাতীয়

চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে পাঠানো, প্রথম দিনেই নিহত ১৭ বাংলাদেশি


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৪ এএম

চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে পাঠানো, প্রথম দিনেই নিহত ১৭ বাংলাদেশি
ছবি: সংগৃহীত

চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। সংস্থাটির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনেই নিহত হন ১৭ বাংলাদেশি। এ ঘটনায় মানবপাচার চক্রের তিনটি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মোহা. আসাদুজ্জামান। এ ঘটনায় মানবপাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তারের কথাও জানান তিনি।

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে মানবপাচার চক্রের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশিকে ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় রাশিয়ায় পাঠানো হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাদের মধ্যে ২১ জনকে জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানের মাধ্যমে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল।

সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর বাংলাদেশিদের একটি স্থানীয় হোটেলে আটকে রাখা হয়। এ সময় তাদের পাসপোর্ট, মুঠোফোন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জব্দ করা হয়। পরে প্রতিশ্রুত চাকরিতে নিয়োগ না দিয়ে তাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তিনি জানান, ভুক্তভোগীরা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আকুতি মিনতি করলেও তাদের ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়নি। পরে একটি সামরিক শিবিরে নিয়ে তাদের ২১ দিনের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

এসআরবির অনুসন্ধানে ৩০ জনের মধ্যে প্রায় ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলা, তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ওই ৩০ জনের মধ্যে দুজন গুরুতর আহত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় তাদের ফিরিয়ে আনা হয়। তাদের একজন রাজন, অন্যজন আদনান। রাজন দুই পায়ে গুরুতর আঘাত নিয়ে চলাফেরা করছেন বলে জানান এসআরবির কর্মকর্তা।

রাজনের বর্ণনা অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশিদের তিনটি দলে ভাগ করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। প্রথম দলে ১৬ জনকে ফ্রন্টলাইনে, মাঝের দলে ছয়জনকে এবং শেষ দলে আটজনকে মোতায়েন করা হয়েছিল।

মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, যুদ্ধের প্রথম দিন ফ্রন্টলাইনে থাকা ১৬ জনের মধ্যে ১২ জন ড্রোন হামলায় নিহত হন। মাঝের দলে থাকা ছয়জনের মধ্যে চারজন এবং শেষ দলে থাকা আটজনের মধ্যে চারজন মারা যান। সব মিলিয়ে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে প্রথম দিনের ঘটনায় নিহত হন ১৭ জন।

রাজনের আহত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে এসআরবির কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে তার পিঠের ওপর একটি ড্রোন পড়ে। এতে তার কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হতে থাকে। পরে ওয়াকিটকির মাধ্যমে একজন মিশরীয় অনুবাদকের সহায়তায় তাকে উদ্ধারের অনুরোধ জানানো হয়। তবে তাকে উদ্ধারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজনের বর্ণনা অনুযায়ী, শরীরের ওপরের অংশের ভর দিয়ে বুক মাটিতে ঘষতে ঘষতে প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তিনি শিবিরের কাছাকাছি পৌঁছান। পরে চিকিৎসার জন্য গেলে প্রথমে তার কাছে থাকা অস্ত্রের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। জীবন বাঁচাতে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে আসার কারণে অস্ত্র সঙ্গে আনা সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান।

এসআরবির কর্মকর্তারা জানান, ওই ৩০ বাংলাদেশির তালিকা ও মুঠোফোন নম্বর তাদের কাছে রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে মৃত্যুর প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। নিহতদের বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অনেকে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কিংবা অন্যের কাছ থেকে ধার করে বিদেশে গিয়েছিলেন।

মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, অনেক পরিবার এখনো তাদের স্বজনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। কোনো কোনো পরিবারের ছোট সন্তান রয়েছে, কিন্তু তাদের খাবারের ব্যবস্থাও নেই। বিভিন্ন সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রায় ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও তাদের পরিবারের সদস্যরা এখনো স্বজনদের মরদেহ দেখতে পারেননি।

বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এসআরবি। সংস্থাটির প্রাথমিক ধারণা, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য এসব বাংলাদেশিকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে।

এ বিষয়ে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক প্রস্তুতি কিংবা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই বাংলাদেশিদের মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল। প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাদের একধরনের ‘শিকার’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার আগে এবং সেখানে পৌঁছানোর পরও ভুক্তভোগীরা মানবপাচার চক্রের সদস্যদের কাছে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরি থেকে শুরু করে বিমানে তুলে দেওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় চক্রের সদস্যরা জড়িত ছিলেন বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

এসআরবির এই কর্মকর্তা বলেন, ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যরা অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চান। অনেক পরিবার তাদের সন্তান কিংবা স্বামীর মরদেহ দেখার সুযোগও পাননি। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করতে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ তদন্তকারী সংস্থাকে দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, মানবপাচার চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তদন্তকারী সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে এবং অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে তারা বদ্ধপরিকর।