পশ্চিমবঙ্গে শাসকদলের দুর্নীতি ও একজন আমির খান

২০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:০৮ পিএম | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৯:৪৯ এএম


পশ্চিমবঙ্গে শাসকদলের দুর্নীতি ও একজন আমির খান

ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গে শাসকদল তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের বাড়ি থেকে বান্ডিল বান্ডিল টাকা উদ্ধার হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। বস্তুত বেশ কয়েকবার ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) তল্লাশিতে কোটি কোটি বেআইনি টাকা উদ্ধার হওয়ার পর বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে ভালভাত হয়ে গেছে।

রাজ্যের সাধারণ মানুষ ধরেই নিয়েছেন তৃণমূলের যে কোনো পর্যায়ের নেতার বাড়িতে তল্লাশি চালালেই এই রকম অবৈধ টাকা ও সম্পত্তির খোঁজ পাওয়া যাবে।

সম্প্রতি কলকাতার বন্দর এলাকা গার্ডেনরিচে আমির খান নামে এক পরিবহন ব্যবসায়ীর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ইডি ১৮ কোটি টাকা উদ্ধার করেছে। এই ঘটনাটি একটু বিশদে দেখলে বোঝা যাবে তৃণমূল সরকার দুর্নীতির যে মহীরূহ তৈরি করেছেন, তার শেকড় আসলে কতদূর পৌঁছেছে। রাজ্যের শীর্ষস্তরের মন্ত্রীরা নিজেরা শুধু যে অবৈধ টাকার পাহাড় বানিয়েছেন তাই নয়, তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা যে ব্যাপক দুর্নীতি করেছে, তাতেও মদদ দিয়ে চলেছে।

চমকে দেওয়ার মতো অভিযোগ সামনে এসেছে। এই আমির খানের বিরুদ্ধে বহু আগে অভিযোগ করা হলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেওয়া হয়নি। গার্ডেনরিচের আমির খানের বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য কলকাতার
চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক ২০২১ সালে কলকাতা পুলিশের পার্কস্ট্রিট থানাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আদালতের সেই নির্দেশ সত্ত্বেও ওই থানার পুলিশ কোনোরকম হেলদোল দেখায়নি। এই
অভিযোগ করেছে খোদ ইডি। ইডির তদন্তকারীরা এই ঘটনায় হতবাক হয়ে গেছে। আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও কোনো থানা তদন্ত না করে কী করে চুপ থাকতে পারে।

ইডির স্পষ্ট অভিমত, শাসকদলের শীর্ষস্তরের কোনো নেতাকর্মীর প্রত্যক্ষ প্রশ্রয় না থাকলে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে না।

বিভিন্ন সময় সমাজের নানা স্তর থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে কখনো নিষ্ঠুরতার, কখনোবা অতি সক্রিয়তার অভিযোগ উঠে। আবার থানায় অভিযোগ দিয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সেটিকে গুরুত্ব না দেওয়ায় সম্প্রতি কলকাতার উপকণ্ঠে দুই কিশোরকে প্রাণ হারাতে হয়েছে।

আদালত আমির খানের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত করতে বলা সত্ত্বেও পুলিশের নিশ্চেষ্ট থাকার পেছনে কোনো রহস্য আছে, সেটাই ভাবাচ্ছে ইডির কর্মকর্তাদের। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে ওই তদন্ত গতি হারিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেই এই রহস্য ভেদ করতে চাইছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, পার্কস্ট্রিট থানা এলাকায় কল সেন্টারের আড়ালে আমির প্রতারণার কারবার চালাতেন বলে একটি বেসরকারি ব্যাংক ২০২১ সালে সরাসরি আদালতে অভিযোগ করেছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারক পার্কস্ট্রিট থানার তৎকালীন ওসি শেখ আমানুল্লাকে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আমানুল্লা বর্তমানে বদলি হয়ে অন্য থানায় চলে গেছেন। তাকে এবং তদন্তকারী অফিসারকে জেরা করে তদন্ত না করার আসল কারণ জানতে চায় ইডি। রাজ্য মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্যের সঙ্গে আমানুল্লার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানতে পেরেছে ইডি। তাদের সন্দেহ, ওই প্রভাবশালী নেতার চাপেই আমিরের বিরুদ্ধে তদন্ত শুধু কথার কথা থেকে গেছে।

এদিকে আমানুল্লার সঙ্গে সাংবাদিকরা বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি ফোন ধরেননি। জবাব দেননি হোয়াটসআপকলেরও। তবে কলকাতা পুলিশের একটি সুত্র জানিয়েছে, আমিরের বাড়িতে ইডির অভিযান হওয়ার পরে নড়েচড়ে বসেছেন পুলিশের সদর দফতরের কর্তারা।

আমিরের বিরুদ্ধে পার্কস্ট্রিট থানার সেই মামলার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এক ডেপুটি কমিশনার পদমর্যাদার অফিসারকে। ইডি অফিসারদের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশে মামলা দায়ের করা হলেও আমিরের বিরুদ্ধে তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ওই মামলার কোনো তদন্তের রিপোর্ট পেশ করা হয়নি। এমনকি এফআইআর দায়ের হওয়া সত্ত্বেও কোনো চার্জশিট দেওয়া হয়নি।

ইডির তদন্তে জানা গেছে, মামলা হওয়ায় আমির তার পার্কস্ট্রিট থানা এলাকার অফিসটি বন্ধ করে দিলেও বহাল তবিয়তে প্রতারণার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। শুধু পার্কস্ট্রিটের ওই অফিস থেকে প্রতারণা ব্যবসার ঠাঁই বদল করে নিয়েছিল কলকাতার লাগোয়া কয়েকটি ভাড়াটে ফ্ল্যাটে।

মোবাইল অ্যাপ প্রতারণার মামলায় মেটিয়াবুরুজের পরিবহন ব্যবসায়ী নিসার আহমেদ খানের ছোট ছেলে আমিরের ঘর থেকে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা উদ্ধার করেছে পুলিশ। ওই ঘটনায় প্রভাবশালীদের যোগসূত্র রয়েছে সেই ইঙ্গিত ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে বলে তদত্তকারীদের দাবি। আমিরের বাড়িতে পাওয়া বিপুল অর্থ শুধু যে অ্যাপ প্রতারণার নয়, তার বাবা ও দাদাকে জিজেস করে সেই ইঙ্গিতও পেয়েছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।

আদালত থেকে ওই মামলার সমস্ত নথি সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করেছে ইডিও। ওই সংস্থার তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, কলকাতা পুলিশের কাছ থেকেও নথি তলব করা হয়েছে। ইডির দাবি, আমির ও মোমিনপুরের বাসিন্দা তার ব্যবসায়ী বন্ধু শাহরিয়া অলির সঙ্গেও রাজ্য মন্ত্রিসভার ওই প্রভাবশালী সদস্যের যোগাযোগ রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। শাহরিয়ারের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছে। দু'জনের মোবাইলই বন্ধ। তাদের মোবাইলের শেষ টাওয়ার লোকেশন বন্দর এলাকায় ছিল বলে জানা গেছে।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

আরএ/


বিভাগ : মতামত