সারাবিশ্ব
ফ্রান্সজুড়ে সহিংসতা ঠেকাতে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন, বিক্ষোভ ঘিরে বাড়তি সতর্কতা
ফ্রান্সে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের আশঙ্কায় দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি নীতির প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভের একাংশে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটার পর শনিবার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন করে সংঘর্ষ ও জননিরাপত্তার অবনতি ঠেকাতে বড় শহরগুলোতে বিশেষ নজরদারির পাশাপাশি কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ শুক্রবার জানান, মোতায়েন করা নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে বিশেষ কমান্ডো দল ও সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটও থাকবে। তাঁর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র-বামপন্থী হিসেবে পরিচিত কিছু গোষ্ঠী সহিংসতার উসকানি দিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নুনেজ বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত রয়েছে এবং কোনো ধরনের নৈরাজ্য সহ্য করা হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সহিংস কর্মকাণ্ডকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা হবে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্যারিস, মার্সেই ও লিওঁসহ একাধিক শহরে শুরুতে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হলেও পরে কিছু এলাকায় তা সহিংসতায় রূপ নেয়। বিক্ষোভের আড়ালে সংঘবদ্ধ ব্যক্তিদের ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। লিমোজ শহরে ঐতিহাসিক সিটি হলে আগুন লাগার ঘটনায় ভবনটির একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কিছু অংশ ধসে পড়ে। এসব ঘটনার পর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থলের নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।
সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত পুলিশি ব্যবস্থার পাশাপাশি জলকামান, সাঁজোয়া যান, অশ্বারোহী পুলিশ, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন শহরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হবে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রধান সড়ক, বাণিজ্যিক এলাকা এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষের স্থানগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, বিক্ষোভের কারণে জনজীবন স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি সম্পদহানি ও প্রাণহানির ঝুঁকি কমানো।
এদিকে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। চলমান বিক্ষোভ ও সহিংসতা সামাল দেওয়া মাখোঁ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে গত শনিবার দেশজুড়ে সংঘটিত দাঙ্গা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার বিষয়টি সরকার স্বীকার করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন করে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে তা রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়াতে পারে।
ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের অনুমতি নিয়েও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। লিওঁ শহরের কেন্দ্রস্থলে সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্যারিসে ইউনিয়নগুলোকে নির্ধারিত একটি রুটে সীমিত পরিসরে মিছিল করার অনুমতি দেওয়া হলেও শহরের মূল এলাকা এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের প্রধান সংগঠন ইউএনইএফ এবং ঐতিহাসিক ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের পক্ষ থেকে আয়োজনের জন্য আবেদন করা সমাবেশগুলোর অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইউএনইএফ।
নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় প্যারিসের বিখ্যাত লুভর জাদুঘরসহ বেশ কয়েকটি বড় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান শনিবার বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, বড় জনসমাগমকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘর্ষ বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটতে পারে। এ কারণে সাংস্কৃতিক স্থাপনা, পর্যটনকেন্দ্র ও জনবহুল এলাকাগুলোতেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের দাঙ্গায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে ২১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের প্রায় অর্ধেকই এর আগে কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন না বলে তিনি জানান। তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সরকারের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নিয়ে বিরোধী দল ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর মধ্যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বামপন্থী রাজনৈতিক দল লা ফ্রান্স ইনসুমিজের অভিযোগ, সমাবেশ নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে সরকার গণতান্ত্রিক অধিকার সীমিত করছে এবং দেশকে পুলিশি নিয়ন্ত্রণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দলটির মতে, এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ পরিস্থিতি শান্ত করার পরিবর্তে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, সরকার জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংসতা প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে।
রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি বিভিন্ন দলের কর্মসূচিও নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাওয়া ডানপন্থী নেতা মারিন ল্য পেনের দলের একটি সমাবেশ ওরলিঅঁ শহরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বামপন্থী ও বর্ণবাদবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও রাজপথের বিক্ষোভ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ফ্রান্সের বাইরেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সরকারি ব্যয় সংকোচন, আবাসনসংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ইতালির মিলান, রোম ও তুরিন; অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা; স্পেনের মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা; পর্তুগালের লিসবন ও পোর্তো; আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন এবং আলবেনিয়ার তিরানায় শনিবার বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির ধরন ও পরিস্থিতি দেশভেদে ভিন্ন হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
এদিকে, শুক্রবার প্যারিসের কাছে ট্রাপেস শহরে গোলাগুলির ঘটনায় একজন নিহত এবং ১২ বছর বয়সী এক শিশুসহ চারজন আহত হয়েছেন। পুলিশ ধারণা করছে, ঘটনাটির পেছনে বর্ণবাদী বিদ্বেষ কাজ করে থাকতে পারে। তবে হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বিক্ষোভ, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং এই গোলাগুলির ঘটনার পর ফ্রান্সের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, ফ্রান্সে বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতা ঠেকানো, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার বজায় রাখা-এই তিনটি বিষয় এখন সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। শনিবারের কর্মসূচিগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করবে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতি, বিক্ষোভকারীদের আচরণ এবং সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার ওপর।