ঐক্যফ্রন্টের ব্যর্থতার দায় জোটের সবার নেয়া উচিত: মান্না

২৪ আগস্ট ২০২০, ০৮:২৯ এএম | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:৪৮ পিএম


ঐক্যফ্রন্টের ব্যর্থতার দায় জোটের সবার নেয়া উচিত: মান্না
ছবি সংগৃহীত

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যর্থতার দায় জোটের সবারই নেয়া উচিত। এককভাবে কাউকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সব মিলিয়ে জোটের কর্মকাণ্ডে একটা বিভ্রান্তি ছিল। নির্বাচনের পর আমরা যে আন্দোলন রাজপথে গড়তে চেয়েছিলাম, একটি দলের জন্য বাস্তবে তা পারিনি।

ঐক্যফ্রন্ট গঠন ছিল সময়ের দাবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের হয়তো আস্থা না থাকার কারণে জোট এখন নিষ্ক্রিয়। তবে এখন কারও কারও আচার-আচরণে মনে হচ্ছে ফ্রন্ট ছাড়তে চাইছে। তবে সেটা হবে দুর্ভাগ্যজনক।

তিনি বলেন, দেশের সব সেক্টরে এখন নৈরাজ্য চলছে। করোনা মোকাবেলা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণেও পুরোপুরি ব্যর্থ সরকার। বিরোধী দলের দুর্বলতার জন্যই সরকার দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে বলেও জানান ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক দলের এই শীর্ষ নেতা।

রাজধানীর গুলশানের নিজ বাসায় সাক্ষাৎকারে মাহমুদুর রহমান মান্না জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন ও নানা পদক্ষেপে ভুলত্রুটি এবং বর্তমান কর্মকাণ্ড, করোনা পরিস্থিতিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন।

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিষ্ক্রিয়। আমরা কাজ করছি না। ঐক্যফ্রন্টের ওপর আমাদের হয়তো আস্থা নেই। সবার কথা বলছি না, কারও কারও আস্থা নেই। আবার কেউ মনে করছে নিজেদের দল গোছাতে হবে।

আসলে যে আশা-আকাক্সক্ষা নিয়ে জোট গঠন করা হয়েছিল, সেটা ঐক্যফ্রন্ট ধরে রাখতে পারেনি। জোট নিয়ে আমাদের এক ধরনের মোহ ছিল, সেটা কেটে গেছে। বাস্তবতায় এসে আমরা ঐক্যফ্রন্টের প্রয়োজনীয়তার মূল্যায়ন করতে পারছি না হয়তো।

ঐক্যফ্রন্টে কোনো একক নেতৃত্ব ছিল না, ছিল যৌথ নেতৃত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি কেউ বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে, সেই কারণে তিনি জাতীয়তাবাদী হতে পারবেন না-এটা কোনো কথা না। সে বিবেচনায় ড. কামাল হোসেন জাতীয়তাবাদী নন-এই ধারণাটা ঠিক হবে না।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে রাজধানীর লেকশোর হোটেলে যখন বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে আমরা বসেছিলাম, তখন সবারই একটা প্রশ্ন ছিল- নির্বাচনে যদি আপনারা জয়ী হন, প্রধানমন্ত্রী কে হবেন। কেউ জবাব দিচ্ছিলেন না।

পরে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, ‘এটা তো এখনই আমরা বলতে পারব না। নির্বাচন হওয়ার পর যে দল বেশি আসন পাবে, সে দল ঠিক করবে।’ এই জবাব নিয়ে আমরা কেউ প্রশ্ন তুলি না।

তার মানে দাঁড়াচ্ছে, জোটগতভাবে আমরা কখনও বলিনি ড. কামাল আমাদের একক নেতা, আমরা নির্বাচনে জিতলে উনিই দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। এখন কেন তাকে দোষ দেবেন-এটা কোনো যুক্তিসঙ্গত কথা হল না।

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমি মনে করি, ঐক্যফ্রন্টের পদক্ষেপগুলো সামগ্রিক অর্থে সঠিক ছিল না। যে ভয়াবহ ঘটনা ২৯ ডিসেম্বর রাতে হয়েছে, তা আমাদের কারও বিবেচনায় ছিল না। আমরা মনে করেছিলাম তারা ভোট কেড়ে নিয়ে যাবে এবং এর বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করব।

আর বড় দল হিসেবে বিএনপির ওপর এর দায়িত্ব ছিল কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, তাদের সেই শক্তি আছে। ৩০ ডিসেম্বর ভোরে নয়, ২৯ তারিখ রাতেই আমরা জেনেছি কী হয়েছে। অথচ ৩০ তারিখ সকালে বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, ‘আমার এলাকায় ভোট দেখেছি ভালো হচ্ছে।’

তাহলে মেসেজটা কী গেল-নির্বাচন ভালো হচ্ছে। ওইদিন সকালে ড. কামালও বলেছেন, ‘নির্বাচনটা ভালো হচ্ছে।’ এর আগে অনেকে আমরা বলেছি ২৬ তারিখের পর পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। কে আমাদের এই ধারণা দিল পরিস্থিতি পাল্টাবে? কেন বললাম এরকম? সব মিলিয়ে একটা বিভ্রান্ত ছিল, এটা আমার মনে হয়েছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে আমরা যে সংলাপে গেলাম, সেখানে যাওয়ার কোনো যুক্তিই ছিল না। যে সংলাপে ওরা (সরকার) আমাদের ডাকেনি, ড. কামাল হোসেন নিজে একটা চিঠি লিখেছিলেন।

পরে এক বৈঠকে বললাম যে, বুঝতে পারলাম না আমরা কেন উদ্যোগী হয়ে এতকিছু করতে গেলাম। আমাকে বলা হল, রাখো না; উনি মুরুব্বি হিসেবে চিঠি দিতে পারেন না? চুপ করে ছিলাম। তখন এ ব্যাপারে বিএনপিও কিছু বলল না যে, ওই সংলাপে আমরা যাব কেন?

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী সংলাপে যখন অঙ্গীকার করেছিলেন মামলা তুলে নেবেন, লিস্ট দিয়ে যান। সব গায়েবি মামলা বন্ধ হবে। আমাদের কথা ছিল ২৪ ঘণ্টা বা ৪৮ ঘণ্টা পরও যদি মামলা তুলে না নেন, তাহলে আমরা প্রোগ্রামে যাব না। কিন্তু কিছুই করিনি।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক বলেন, এখন কী করা যেতে পারে, তা নিয়ে আমরা নির্বাচনের পর ৩১ ডিসেম্বর বিকালে বসেছিলাম। আমার প্রস্তাব ছিল- এত বীভৎস একটা ঘটনা ঘটেছে, এর বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন কর্মসূচি দিতে হবে-তিন-চার দিন ধরে।

তখন বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হল- আমরা এ ধরনের কোনো প্রোগ্রামে যেতে পারব না। আমি জিজ্ঞেস করলাম সমস্যা কী? ওনারা বললেন, আসলে হামলা-মামলায় একদম বিপর্যস্ত বিএনপি।

প্রোগ্রাম হয়নি আর। বিএনপি যদি দিতে না পারে, আমরা দিলে তো সেরকম হবে না। ব্যক্তিগতভাবে আমি এখনও মনে করি, কোনোভাবে তখন একটি কল সফল হতোই। কারণ, নির্বাচন কী হয়েছে, মানুষ দেখেছে তো।

ঐক্যফ্রন্ট গঠন ছিল সময়ের দাবি উল্লেখ করে ডাকসুর এই সাবেক ভিপি বলেন, জোট গঠন একেবারেই পারফেক্ট ছিল। ঐক্যফ্রন্ট শুধু নির্বাচনী মোর্চা, সেটাই ঠিক ছিল। ফিলিপাইনের উদাহরণ দিয়ে আমি বহু সময় বক্তৃতায় বলেছি, আমাদের নির্বাচনের পরেই আন্দোলনে নামার প্রয়োজন হতে পারে।

সেই প্রস্তুতি আমাদের রাখা উচিত। আসলে আমরা আগে থেকেই আন্দোলনটা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আন্দোলনের কোনো পদক্ষেপ ছিল না। ঐক্যফ্রন্ট এখনও বিলীন হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, আমি মনে করি, ঐক্যফ্রন্ট আগামী দিনেও থাকা উচিত। কেউ ফ্রন্ট ছেড়ে যেতে চাইলে সেটা দুর্ভাগ্যজনক হবে। কারও কারও আচার-আচরণে এমন মনে হয়। ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে গেলে লাভবান হবে ক্ষমতাসীন দল।

করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সর্বশেষ স্বাস্থ্যমন্ত্রী একটা বক্তব্য দিয়েছেন, ‘ভ্যাকসিন লাগবে বলে আমার মনে হয় না, করোনা এমনিতেই দেশ থেকে চলে যাবে।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করছে, আমাদের দেশের বিশেজ্ঞরা বলছেন, করোনা এখনও যায়নি।

এখনও প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০ জন করে মারা যাচ্ছেন। আক্রান্ত কমেনি। অথচ হাসপাতাল কমিয়ে দিয়েছে। অন্যান্য কোনো রকম সুযোগ-সুবিধা বাড়াইনি। স্বাস্থ্যসেবার মান ভয়ংকর খারাপ।

এখানে দুর্নীতির কথা প্রকাশিত হয়েছে। মাস্ক নিয়ে শুরু, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ পত্রিকায় আসছে। কোনো তদন্ত করা হয়েছে? মানে একটা সাহেদ আর সাব্রিনাকে দেখিয়ে ভাব করেছে অনেক কিছু করলাম। কীভাবে যন্ত্রপাতিগুলো এলো, কারা জড়িত, কাস্টমস কী করল-কোনো তদন্ত নেই।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক বলেন, আমি মনে করি, এখনও সময় আছে একটা টাস্কফোর্স করা। একটা হবে হেলথের ওপর। এখানে বিশেষজ্ঞদের লিডারশিপ লাগবে। তাদের সাজেশন লাগবে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও একইভাবে বিশেষজ্ঞদের অর্থাৎ অর্থনীতিবিদ, এনজিও ব্যক্তিত্ব যারা এ ব্যাপারে জানেন, তাদের নিয়ে একটি কমিটি করা, যেটা যে কোনো নামে হতে পারে। দুর্নীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ দেখছি না; যা হচ্ছে তা সবই আইওয়াশ।

যেমন ক্যাসিনোয় যারা যুক্ত ছিলেন, তারা এখন হাসপাতালে আছেন, জেলে নেই। তারা ভালো আছেন। আমরা সবাই জানি, ক্যাসিনো-কাণ্ড নিয়ে বিরাট কোনো সাজা হবে না। আমাদের দেশে আইন এটা বলে না।

 

সূত্র: যুগান্তর।