সারাবিশ্ব
নাজিব রাজাকের কারাদণ্ড থেকে গৃহবন্দিত্ব: মালয়েশিয়ায় নতুন করে তুমুল বিতর্ক
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে কারাদণ্ডের বাকি সময় গৃহবন্দি অবস্থায় কাটানোর অনুমতি দেওয়াকে কেন্দ্র করে দেশটিতে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। শর্তসাপেক্ষ রাজকীয় ক্ষমার আওতায় নাজিবকে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে সিদ্ধান্তটি নিয়ে সমালোচকদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন-রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কেন কারাগারের পরিবর্তে নিজ বাড়িতে থাকার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
কুয়ালালামপুর থেকে এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম নাজিব রাজাকের ছয় বছরের কারাদণ্ডের অবশিষ্ট সময় গৃহবন্দি অবস্থায় কাটানোর আবেদন অনুমোদন করেন। তবে এই সুবিধা পেতে নাজিবকে ৫ কোটি মালয়েশীয় রিঙ্গিত, যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ, জরিমানা পরিশোধ করতে হবে।
৭৩ বছর বয়সী নাজিব রাজাককে ২০২২ সালে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ১মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ বা ওয়ানএমডিবি থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় তাঁর ভূমিকার জন্য কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মালয়েশিয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে এই কেলেঙ্কারি নিয়ে তদন্ত হয়েছে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ২০১০-এর দশকে ওয়ানএমডিবি থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার আত্মসাৎ করা হয়েছিল। এই ঘটনা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় অর্থ কেলেঙ্কারি হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে।
নাজিবের বিরুদ্ধে ওয়ানএমডিবি-সংক্রান্ত আরও একটি মামলাও চলমান রয়েছে। ওই মামলায় তাঁকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং তিনি সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করছেন। ফলে গৃহবন্দিত্বের অনুমতি পেলেও তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।
ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারি মালয়েশিয়ার রাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। এই ঘটনায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন বা ইউএমএনও ব্যাপক রাজনৈতিক চাপে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে দলটির প্রায় ছয় দশকের ক্ষমতার অবসান ঘটে। তবে রাজনৈতিকভাবে নাজিব এখনো ইউএমএনওর তৃণমূল পর্যায়ের অনেক কর্মী-সমর্থকের কাছে জনপ্রিয়।
গৃহবন্দিত্বের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সমালোচকেরা বলছেন, নাজিবের কারাগারেই থাকা উচিত। ৪৯ বছর বয়সী উদ্যোক্তা জেমস চাও প্রশ্ন তুলেছেন, আরও কয়েকটি মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় একজন দোষী সাব্যস্ত সাবেক নেতাকে কীভাবে গৃহবন্দি থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত আইনের প্রতি মানুষের আস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
তবে নাজিবের সমর্থকেরা রাজার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের একটি অংশ মনে করছেন, কারাগারে থাকার পরিবর্তে পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে থাকার সুযোগ পাওয়া নাজিবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ৬৮ বছর বয়সী সমর্থক রাদিয়া রশিদ বলেন, নাজিবকে সমর্থন করেন এমন মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তাঁর গৃহবন্দিত্বের সুযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। আরেক সমর্থক সুজ্জালিনা আনুরা বলেন, নাজিবকে পুরোপুরি মুক্তি দেওয়া সম্ভব না হলেও অন্তত পরিবারের সদস্য, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে বাড়িতে থাকার সুযোগ পাওয়া স্বস্তির বিষয়।
এদিকে নাজিবের জরিমানা পরিশোধে অর্থ সংগ্রহের জন্য তাঁর সমর্থকদের পক্ষ থেকে একটি তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচারণা শুরুর পর সোমবার পর্যন্ত সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ ১০ লাখ রিঙ্গিত ছাড়িয়ে গেছে। তবে এই উদ্যোগ নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ প্রতিবাদ হিসেবে মাত্র ১ সেন বা ০.০১ রিঙ্গিত করে অনুদান দিয়েছেন।
একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী শ্যাম প্রিয়াহ বলেন, রাজার সাংবিধানিক ক্ষমতাকে তিনি সম্মান করেন। তবে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিপুল জরিমানা পরিশোধের জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নেওয়া সামান্য অর্থও অনেকের এক বেলার খাবারের খরচ হতে পারে।
এই পরিস্থিতি ইউএমএনওর জন্যও নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে দলটির ঐতিহ্যগত সমর্থকদের কাছে নাজিবের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে তরুণ ও মধ্যপন্থী ভোটারদের একটি অংশ দুর্নীতির বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়। ফলে নাজিবকে ঘিরে প্রকাশ্য সমর্থন দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।
মালয়েশিয়ার নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মালয়েশীয় রাজনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ব্রিজেট ওয়েলশের মতে, নাজিবকে ঘিরে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ ইউএমএনওকে একটি কঠিন রাজনৈতিক অবস্থানে ফেলেছে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই উদ্যোগ দলটির ঐতিহ্যগত সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতে সহায়তা করতে পারে। তবে একই সঙ্গে তরুণ ও মধ্যপন্থী ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মালয়েশিয়ায় পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ২০২৮ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে নাজিব রাজাককে ঘিরে গৃহবন্দিত্ব, জরিমানা পরিশোধের জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারির রাজনৈতিক প্রভাব-সবকিছুই ইউএমএনওর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। নাজিবের প্রতি ঐতিহ্যগত সমর্থন ধরে রাখার পাশাপাশি দুর্নীতি নিয়ে সমালোচনার জবাব দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আস্থা অর্জন-এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই দলটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।