সারাবিশ্ব

যুদ্ধের ধাক্কায় বিপর্যস্ত কাতারের গ্যাস রপ্তানি, রাজস্ব কমেছে ৪২ শতাংশ


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম

যুদ্ধের ধাক্কায় বিপর্যস্ত কাতারের গ্যাস রপ্তানি, রাজস্ব কমেছে ৪২ শতাংশ
ছবি: সংগৃহীত

কাতারে গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটির সরকারি রাজস্ব আয় ৪২ শতাংশ কমেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে বিঘ্ন এবং রাস লাফান শিল্পনগরীর জ্বালানি অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে দেশটির জ্বালানি খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। মঙ্গলবার দোহার শুরা কাউন্সিলের বার্ষিক অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় এ তথ্য জানান কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি।

আমিরের বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রভাবে কাতারের জ্বালানি রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় সরকারি রাজস্বে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে রাজস্ব আয় ৪২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। দেশটির অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকায় উৎপাদন ও রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার প্রভাব সরাসরি সরকারি আয়ে পড়েছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক কাতারের জন্য রাস লাফান শিল্পনগরী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শিল্পাঞ্চলে এলএনজি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। সংঘাতের মধ্যে এসব স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় দেশটির জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা ও রপ্তানি কার্যক্রম চাপে পড়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস সরবরাহ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট। কাতারের এলএনজি রপ্তানির বড় অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হলে শুধু কাতার নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারদরেও প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

তবে স্বল্পমেয়াদি সংকট সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে না কাতার। শুরা কাউন্সিলের অধিবেশনে আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি জানান, দেশটির বৃহৎ নর্থ ফিল্ড গ্যাস প্রকল্পের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে চলছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে কাতারের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।

নর্থ ফিল্ড বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রগুলোর একটি। পারস্য উপসাগরের নিচে অবস্থিত এই গ্যাসক্ষেত্র ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের সঙ্গে একই ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর অংশ। এর সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে কাতারের বার্ষিক এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা ১৪২ মিলিয়ন টনে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাজারে গ্যাসের চাহিদা পূরণ এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে দেশটি আরও সুবিধা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে এক্সনমোবিলের সঙ্গে অংশীদারত্বে কাতারের গোল্ডেন পাস এলএনজি প্রকল্পও দেশটির দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাতার মনে করছে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে উৎপাদন সম্প্রসারণ ও বিদেশে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা জরুরি।

এদিকে, চলমান সংঘাতের কারণে কাতারের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিবেদনে চলতি বছর দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, কাতারের বর্তমান পরিস্থিতি দেশটির সরকারি রাজস্বে জ্বালানি খাতের ওপর নির্ভরশীলতার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। গ্যাস রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরে দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে উৎপাদন স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে সরকারি আয়, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

সব মিলিয়ে, কাতারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক করা এবং অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করা। দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সম্প্রসারণ প্রকল্পগুলো ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ধরে রাখলেও স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি নির্ভর করবে আঞ্চলিক সংঘাতের পরিস্থিতি, রাস লাফানের উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার ওপর।