সারাবিশ্ব
চীনের ‘গ্রে জোন’ কৌশল: যুদ্ধ ছাড়াই তাইওয়ান ও মিত্রদের চাপে রাখার চেষ্টা
তাইওয়ানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন করা এবং দেশটির মিত্রদের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে বহুমুখী তৎপরতা চালাচ্ছে চীন। সরাসরি সামরিক সংঘাতে না জড়িয়ে কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামুদ্রিক নজরদারি ও অন্যান্য চাপ সৃষ্টিকারী পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার এই কৌশলকে বলা হচ্ছে ‘গ্রে জোন’ বা ‘ধূসর অঞ্চলের কৌশল’। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের প্রচলিত সীমা অতিক্রম না করেও প্রতিপক্ষের ওপর ধারাবাহিক চাপ তৈরি করাই এ কৌশলের মূল উদ্দেশ্য।
তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা দেশ ও তাদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বেইজিং। তাইওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে প্যারাগুয়ের যোগাযোগমন্ত্রী এবং বেলিজের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে চীন। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোকে সতর্ক করা এবং তাদের কূটনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন আনতে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে-র আফ্রিকার দেশ এসওয়াতিনি সফর ঘিরেও কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়। এপ্রিলে নির্ধারিত সফরের পথে সেশেলস, মরিশাস ও মাদাগাস্কার তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। ফলে সফরটি বাতিল করতে হয়। পরে মে মাসে এসওয়াতিনির রাজার উড়োজাহাজে করে তিনি দেশটি সফর করেন। এ ঘটনাকে তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সীমিত করার ক্ষেত্রে চীনের কূটনৈতিক প্রভাবের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলের আশপাশের জলসীমায় চীনের কোস্টগার্ড ও অন্যান্য সরকারি জাহাজের তৎপরতাও বেড়েছে। এসব জাহাজের নজরদারি, টহল ও পরিদর্শন কার্যক্রমের মাধ্যমে ওই অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করছে বেইজিং। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের তৎপরতা শুধু নিরাপত্তা নজরদারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাইওয়ানের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং আশপাশের জলসীমায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
চীনের দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, তাইওয়ান তাদের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ কারণে দ্বীপটির স্বাধীনতার বিরোধিতা করে বেইজিং এবং অন্যান্য দেশকে তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন না করার আহ্বান জানায়। তবে তাইওয়ানের সরকার চীনের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তাইপের অবস্থান, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার তাইওয়ানের জনগণের রয়েছে। এ বিরোধকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ‘গ্রে জোন’ কৌশলের লক্ষ্য শুধু তাইওয়ানের কূটনৈতিক যোগাযোগ কমিয়ে আনা নয়, বরং দেশটির পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার ধারণা তৈরি করা। অর্থাৎ, তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলে কোনো দেশকে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে-এমন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে বেইজিং। এর মাধ্যমে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি না বাড়িয়েই তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক অবস্থান দুর্বল করার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে চীনের এই চাপের মধ্যেও তাইওয়ানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়েছে জাপান ও ফিলিপাইনের মতো কয়েকটি দেশ। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং তাইওয়ান প্রণালিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা থেকে দেশগুলো তাইওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করছে। এতে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক চাপের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, তাইওয়ান প্রণালিতে উত্তেজনা কমিয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সুস্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন। একই সঙ্গে চীনের সামুদ্রিক ও কূটনৈতিক তৎপরতার জবাবে আঞ্চলিক দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই চাপ সৃষ্টির এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে তাইওয়ানের নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।