সারাবিশ্ব
ফরাসি ব্যাংকে বড় সাইবার হামলা, ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার গায়েব
ইউরোপজুড়ে একের পর এক সাইবার হামলার মধ্যে এবার আক্রান্ত হয়েছে ফ্রান্সের ব্যাংকিং ও বীমা প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট মুতুয়েল আরকেয়া। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার দাবি করেছেন ব্লকচেইনবিষয়ক তদন্তকারী জ্যাকএক্সবিটি। একই সময়ে দেশটির জাতীয় রক্ত সংরক্ষণ সংস্থা ফ্রেঞ্চ ব্লাড এস্টাবলিশমেন্টের তিনটি হিমাগারেও হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম বিএফএমটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রেডিট মুতুয়েল আরকেয়া সাইবার হামলার শিকার হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এ হামলার মাধ্যমে প্রতারণামূলক লেনদেন সম্পন্ন করা হয়েছে।
ব্লকচেইনবিষয়ক তদন্তকারী জ্যাকএক্সবিটি প্রথম ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ চুরির তথ্য প্রকাশ করেন। তার দাবি, চুরি হওয়া অর্থের একটি অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে। এরপর ব্যাংকটি সাইবার হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
তবে চুরি হওয়া অর্থের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ জানায়নি প্রতিষ্ঠানটি। ব্যাংকটির দাবি, এ ঘটনায় গ্রাহকদের কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়নি।
জ্যাকএক্সবিটির ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে চলা এই হামলায় বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। পরে সেগুলো স্টেবলকয়েনে রূপান্তর করা হয়েছে। স্টেবলকয়েন হলো এমন এক ধরনের ডিজিটাল সম্পদ, যার মূল্য মার্কিন ডলারের মতো প্রচলিত মুদ্রার সঙ্গে যুক্ত থাকে।
জ্যাকএক্সবিটি অভিযোগ করেন, কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করতে দেরি হওয়ায় হ্যাকাররা ৩ কোটি ডলারের বেশি অর্থ পাচার করতে পেরেছে। তার মতে, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ ওই অর্থের একটি অংশ জব্দ করতে পারত।
ব্যাংকটি জানিয়েছে, সাইবার হামলার বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পরপরই তাদের সংশ্লিষ্ট দল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। কার্যক্রম সুরক্ষিত রাখা এবং নতুন করে প্রতারণামূলক লেনদেন ঠেকাতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কিছু লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
তবে চুরি হওয়া অর্থের বিশাল অঙ্কের বিষয়ে নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পশ্চিম ফ্রান্সের ব্রিটানিতে সদর দপ্তর অবস্থিত আরকেয়া জানিয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সম্প্রতি বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে ইতিহাসের অন্যতম বড় সাইবার হামলার ঘটনা ঘটে। প্ল্যাটফর্মটির ডিজিটাল সম্পদ থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার চুরি করে নিয়ে যায় হ্যাকাররা। যদিও পরে হাতছাড়া হওয়া সম্পদের ৯০ শতাংশ উদ্ধারের দাবি করেছে বাইন্যান্স।
ওই হামলার ঘটনায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ও বাইন্যান্স উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের দায়ী করেছে। তবে পিয়ংইয়ং এ অভিযোগ স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। বাইন্যান্সে হামলার ঘটনার পর ফরাসি ব্যাংকে নতুন করে সাইবার হামলার ঘটনা সামনে এল।
রক্ত সংরক্ষণ কেন্দ্রে সাইবার হামলা
এদিকে চলতি সপ্তাহে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সুপারমার্কেটের ফ্রিজার ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দূর থেকে হ্যাক করে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে বিপুল পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হয়। এর পর এবার স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনা সামনে এসেছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) গভীর রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে ফ্রেঞ্চ ব্লাড এস্টাবলিশমেন্ট জানায়, সোমবার তাদের তিনটি হিমাগারে সংরক্ষণযন্ত্রের তাপমাত্রা ও বরফ গলানোর সীমা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এসব কেন্দ্রে জরুরি রক্ত সঞ্চালন এবং গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ তৈরির কাজে ব্যবহারের জন্য রক্তরস বা প্লাজমা সংরক্ষণ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই ঘটনায় কোনো মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি এবং একটিও রক্ত বা রক্তের উপাদান নষ্ট হয়নি।’
সংস্থাটি জানিয়েছে, হামলাটি তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্কে চালানো হয়নি। বরং ওই তিনটি কেন্দ্রে সরবরাহ করা হিমায়ন সরঞ্জামের মূল প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থায় হামলা চালানো হয়েছিল।
ইএফএস আরও জানায়, তাদের সতর্কসংকেত ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা দ্রুত অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি শনাক্ত করে। এরপর কারিগরি কর্মীরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন। তারা প্লাজমা ও রক্ত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন অথবা নিরাপদ তাপমাত্রায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন।
বর্তমানে ফ্রান্সজুড়ে ইএফএসের রক্ত সংগ্রহ এবং হাসপাতালগুলোতে সরবরাহের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে জরুরি সেবা ব্যাহত হয়নি। ফ্রান্সের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ও দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ ঘটনা তদন্ত করছে।
সূত্র: এপি, আনাদোলু