আইন আদালত

‘আমি গরিবের ছেলে, লোভ সামলাতে পারিনি’, জবানবন্দিতে সমন্বয়ক পরিচয়ধারী রিয়াদ


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪২ এএম

‘আমি গরিবের ছেলে, লোভ সামলাতে পারিনি’, জবানবন্দিতে সমন্বয়ক পরিচয়ধারী রিয়াদ
ছবি: সংগৃহীত

‘আমি গরিবের ছেলে। টাকার লোভ সামলাতে পারিনি। আমি ক্ষমা চাই।’ সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মি আহম্মেদের বাসায় গিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং ১০ লাখ টাকা আদায়ের ঘটনায় আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এভাবেই নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় ব্যবহার করে সহযোগীদের নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দেওয়া এবং মামলা ও গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় রিয়াদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

সম্প্রতি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক ফিরোজ আহমেদ মুন্সী আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আগামী ১০ নভেম্বর মামলাটির শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত। মঙ্গলবার আদালত সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন জানে আলম অপু, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন এবং একজন শিশু। ছয় আসামিই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। তাদের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

যেভাবে ১০ লাখ টাকা আদায়

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে রিয়াদ চাঁদা আদায়ের পুরো ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। নিজেকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দিতেন বলে জানান তিনি। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিবাদী ব্যক্তিদের গ্রেফতারে পুলিশকে সহযোগিতা করার কথাও দাবি করেন।

জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই রাতে শাম্মি আহমেদ গুলশানের বাসায় অবস্থান করছেন, এমন খবর পেয়ে রিয়াদ ও তার সহযোগীরা থানায় যান। পরে পুলিশের একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে ওই বাসায় অভিযান চালানো হয়। তবে সেখানে শাম্মি আহমেদকে পাওয়া যায়নি।

ফেরার সময় সহযোগী জানে আলম অপু বাসা থেকে একটি ইয়ারপড নিয়ে আসেন। সেটিতে ‘শাম্মি ইয়ারপড’ লেখা ছিল। সেটি ফেরত দেওয়ার কথা বলে পরদিন সকাল ১০টার দিকে তারা আবার ওই বাসায় যান। এ সময় অপু পানি পান করার অজুহাতে বাসার ভেতরে প্রবেশ করেন।

এরপর বাড়ির মালিককে বলা হয়, তারা জানেন তার স্ত্রী বাসায় রয়েছেন এবং তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে। গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে প্রথমে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন তারা। পরে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিলে তাতে রাজি হন আসামিরা। রিয়াদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, আদায় করা ১০ লাখ টাকা তারা নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নেন।

বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে গিয়ে ধরা

জবানবন্দিতে রিয়াদ জানান, বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের জন্য ২০২৫ সালের ২৬ জুলাই বিকেল ৫টার দিকে তিনি ইব্রাহিম হোসেন, সাকাদাউন সিয়াম ও সাদমান সাদাবকে শাম্মি আহম্মেদের বাসায় পাঠান।

তার দাবি, পুলিশ তাকে ফাঁদে ফেলার উদ্দেশ্যে বাসায় যেতে বলেছিল। তখন তিনি একটি গোলচত্বরে অবস্থান করছিলেন। পুলিশের কথায় বিশ্বাস করে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর বাড়ির মালিক থানায় খবর দেন। পরে পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে তাদের হাতেনাতে আটক করে।

সমন্বয়ক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগ

পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসামিরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। এই পরিচয় ব্যবহার করে তারা নিয়মিত বিভিন্ন থানায় যাতায়াত করতেন।

বিভিন্ন মামলার আসামি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার এবং তাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিয়ে পুলিশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন তারা। একপর্যায়ে সেই পরিচয় ও যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের দোসর, সহযোগী কিংবা সমর্থক আখ্যা দিয়ে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা মামলা, গ্রেফতার ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে চাঁদা দাবি এবং আদায় করতেন।

আগে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন রিয়াদ

রিয়াদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আগে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা মহানগর শাখার সদস্য হন। গ্রেফতারের পর তাকে সংগঠনের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

তার বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নে। গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানে তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা এবং ৫ আগস্টের পর জীবনযাত্রায় পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদের দাদা ওয়ালীউল্যাহ রিকশা চালাতেন। তার বাবা আবু রায়হানও একসময় রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। পরে দিনমজুরের কাজ করতেন। পরিবারের দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট রিয়াদ। তার মা ছিলেন গৃহিণী। একসময় অন্যের বাড়িতে কাজও করেছেন তিনি।

নবীপুর হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাসের পর রিয়াদ কোম্পানীগঞ্জের সরকারি মুজিব মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হন।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রিয়াদের গ্রামের বাড়িতে পুরোনো ঘরের পাশে নতুন পাকা বাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছিল। পাশাপাশি তিনি দামি গাড়িও কিনেছিলেন। পরিবারের আগের আর্থিক অবস্থার সঙ্গে তার নতুন জীবনযাপনের এই পার্থক্য স্থানীয়দের মধ্যে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাশের বাড়ির এক বাসিন্দা সে সময় বলেছিলেন, যে পরিবারের সদস্যদের রিকশা চালিয়ে ও দিনমজুরি করে সংসার চালাতে হতো, সেই পরিবারের ছেলের ৫ আগস্টের পর বিলাসী জীবনযাপন এবং পাকা বাড়ি নির্মাণ দেখে তারা অবাক হয়েছেন।

নবীপুর হাই স্কুলের সাবেক সভাপতি শিহাব উদ্দিনও রিয়াদের পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা জানিয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাবার পক্ষে পড়াশোনার খরচ বহন করা সম্ভব না হওয়ায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মিলে তাকে সহযোগিতা করতেন।

অন্যদিকে, সে সময় রিয়াদের মা ছেলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি ছিল, তার ছেলে এমন কাজ করতে পারে না। কেউ ষড়যন্ত্র করে তাকে চাঁদাবাজ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টার সঙ্গে তোলা ছবি পোস্ট করতেন রিয়াদ।

যেভাবে শুরু হয় মামলা

২০২৫ সালের ২৭ জুলাই গুলশান থানায় মামলাটি করেন শাম্মি আহম্মেদের স্বামী সিদ্দিক আবু জাফর (৭৫)। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মি আহম্মেদের পরিবারের বাসা ছিল গুলশান-২-এর ৮৩ নম্বর সড়কে।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, প্রথমে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ওই বাসায় অভিযান চালান আসামিরা। শাম্মি আহম্মেদকে না পেয়ে পুলিশ চলে যাওয়ার পর তারা আবার বাসাটিতে যান। এ সময় তার স্বামীকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে গ্রেফতারের ভয় দেখানো হয় এবং ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। পরে ১০ লাখ টাকা আদায় করেন তারা।

কয়েক দিন পর বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে আবারও বাসায় যান আসামিরা। বিষয়টি বুঝতে পেরে সিদ্দিক আবু জাফর তাৎক্ষণিকভাবে গুলশান থানায় খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আবদুর রাজ্জাক, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন ও কিশোর আমিনুল ইসলামকে আটক করে। পরবর্তী সময়ে জানে আলম অপুকেও গ্রেফতার করা হয়।