সারাদেশ

বাবার মৃত্যুতে থেমেছিল পড়াশোনা, ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস শেফালীর


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৫৬ পিএম

বাবার মৃত্যুতে থেমেছিল পড়াশোনা, ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস শেফালীর
ছবি: সংগৃহীত

শৈশবে বাবাকে হারিয়ে বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। পরিবারের আর্থিক সংকট ও সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে গিয়ে বিসর্জন দিতে হয় নিজের স্বপ্ন। স্বামী, সন্তান ও সংসার সামলাতে কেটে যায় জীবনের দীর্ঘ সময়। তবে শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্নটি কখনো মন থেকে হারিয়ে যায়নি। অবশেষে ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করে সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন শেফালী বেগম।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ নক্তপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শেফালী বেগম। তিনি মকছেদুল আলম মঞ্জুর স্ত্রী। ৪৮ বছর বয়সে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে এলাকায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।

শেফালীর এই সাফল্যে আনন্দিত পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী। তার অর্জন প্রমাণ করেছে, স্বপ্ন পূরণে বয়স কখনো বাধা হতে পারে না।

জানা গেছে, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন শেফালী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোতে ভালো ফলাফল ছিল তার। কিন্তু শৈশবে বাবাকে হারানোর পর পরিবারের ওপর নেমে আসে নানা সংকট। আর্থিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতায় একসময় বন্ধ হয়ে যায় তার পড়াশোনা। ১৯৮৫ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে এসে আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

স্বামী, সন্তান ও পরিবারের দেখভাল করেই কেটে যায় জীবনের দীর্ঘ সময়। তবে উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর স্বামী ও তিন সন্তানের অনুপ্রেরণায় আবারও বই-খাতা হাতে তুলে নেন। ৪৮ বছর বয়সে শুরু করেন নতুন করে পড়াশোনা। সংসারের কাজ সামলে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যান। দীর্ঘদিনের বিরতি ও বয়সের কারণে পথটি কঠিন হলেও দমে যাননি শেফালী। অবশেষে তার সেই পরিশ্রম সাফল্য এনে দিয়েছে।

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের এইচএসসি (বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৩.৯৬ এবং ঐচ্ছিক বিষয়সহ জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। শেফালী বেগম গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।

পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্বও পালন করেছেন শেফালী। সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব সামলে ২০১১ সালে ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। টানা দুই মেয়াদে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন।

মায়ের এমন অর্জনে উচ্ছ্বসিত তার মেয়ে মাকছুরা খানম নাসমুনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। মাকছুরা বর্তমানে রংপুর সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত।

তিনি বলেন, মায়ের এই অর্জন শুধু আমাদের পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, সমাজের অন্য নারী ও শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জন্যও বড় অনুপ্রেরণা। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, শেখার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো বয়সেই স্বপ্ন পূরণ করা যায়।

নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত শেফালী বেগম বলেন, ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর গ্রামের কুসংস্কার ও পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে তার বিয়ে হয়। তখন তিনি অষ্টম শ্রেণি পাস করেছিলেন। বিয়ের পর সংসারের কাজের ব্যস্ততায় আর পড়াশোনা করা হয়নি। তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোতে বরাবরই মেধাতালিকায় ছিলেন তিনি।

শেফালী বলেন, স্বামী ও সন্তানদের অনুপ্রেরণায় ২০২০ সালে আবারও পড়াশোনা শুরু করেন। ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে পাস করেছেন। এই সাফল্যকে জীবনের অন্যতম বড় স্বপ্ন পূরণ হিসেবে দেখছেন তিনি।

শেফালীর স্বামী মকছেদুল আলম মঞ্জু বলেন, পরিবারের কথা ভেবে তার স্ত্রী নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন পর হলেও সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছেন। এটি তাদের পরিবারের জন্য অনেক আনন্দের। ভবিষ্যতেও স্ত্রীর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথে পাশে থাকবেন বলে জানান তিনি।

গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ দিলীপ রায় বলেন, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে শেফালী বেগমের মতো সংগ্রামী শিক্ষার্থী খুব কমই দেখেছেন। তার সাফল্য প্রমাণ করে, শিক্ষার ক্ষেত্রে বয়স কোনো বাধা নয়। প্রয়োজন প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়। শেফালীর অর্জনে তারা গর্বিত।

শেফালী বেগমের এই সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প নয়, বরং প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণের অনন্য দৃষ্টান্ত। তার অর্জন আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, শেখার কোনো বয়স নেই, আর দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায়েই নতুন করে শুরু করা সম্ভব।