সারাদেশ
সাংবাদিক আলিফ হত্যায় সরাসরি অংশ নেন ৫ জন, গুলি করেন তাজুল
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যার পরিকল্পনা করেন তাজুল ইসলাম। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিনি নিজেও সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন। এ হত্যাকাণ্ডে মোট পাঁচজন অংশ নিয়েছিলেন। গ্রেপ্তার দুই আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাতে এসব তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার ১ নভেম্বর বিকেলে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়ার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন গ্রেপ্তার ইমরান ইসলাম ওরফে ইমন, বয়স ২৪ বছর এবং সাব্বির আহম্মেদ, বয়স ২৫ বছর। বিকেল পৌনে ৪টায় শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৭টায় তাদের জবানবন্দি গ্রহণ শেষ হয়। পরে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, দুই আসামির জবানবন্দি অনুযায়ী, আলিফের সঙ্গে তাজুলের আগে থেকেই বিরোধ ছিল। সীমান্ত এলাকায় তাজুলের বিভিন্ন ব্যবসা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতেন আলিফ। এসব কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও তথ্য দিতেন তিনি। এ কারণে তাজুল ও তার সহযোগীদের মধ্যে আলিফের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়। সেই বিরোধ থেকেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
ওসি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি পাঁচজন অংশ নেন। তারা তাজুলের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন এবং সীমান্ত এলাকায় তাদের ব্যবসা ছিল। তাজুল নিজেও হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। আলিফের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লোকজন ঘটনাস্থলে আসতে শুরু করলে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যান।
জবানবন্দিতে তাজুল ছাড়াও আরও কয়েকজনের নাম এসেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় প্রকাশ করছে না পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যেই আপাতত তাদের নাম গোপন রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাজুলের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র, মাদক, বিস্ফোরক, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধে অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে। সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালানের সঙ্গে তার বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। এলাকায় নিজের নামে সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নিহত আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা এর আগে জানিয়েছিলেন, তাজুলের চোরাচালান ও অস্ত্রসংক্রান্ত তথ্য পেয়ে আলিফ তা তৎকালীন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে দিয়েছিলেন। প্রায় চার বছর আগে এ বাহিনী তাজুলকে গ্রেপ্তার করেছিল।
এর আগে গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ জানিয়েছিলেন, তাজুলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করতেন আলিফ। তাজুলের বাড়ির ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তাজুলের কাছে অস্ত্র রয়েছে এবং সেই তথ্য আলিফ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়েছেন, এমন ধারণা থেকে তার ওপর ক্ষোভ তৈরি হয়। এ ক্ষোভের জেরেই এর আগে আলিফের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছিল।
গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ বিরিশিরি সড়কের উত্রাইল বাজারসংলগ্ন তেলনজিয়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ। তিনি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে সীমান্ত এলাকার চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন আলিফের স্ত্রী বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
এরপর গত শনিবার ভোরে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর বাজার এলাকা থেকে ইমরান ও সাব্বিরকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। তাদের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এ মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়ায় চারজনে। এর আগে ১৮ অক্টোবর সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব এবং ২০ অক্টোবর আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে স্বামী হত্যার পর আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়া আনন্দিতা সাংমার চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে। নেত্রকোনা ১ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের উদ্যোগে সেখানে তার চাকরির ব্যবস্থা করা হয়।
আনন্দিতা সাংমা বলেন, ‘গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর একজন নারী আমাকে ফোন করে সহযোগিতার কথা বলেছেন। আমার ব্যাংক হিসাবের নম্বর চেয়েছেন। এরপর আরও অনেকে ফোন করে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। চাকরির ব্যবস্থা হওয়ায় আপাতত অন্য কারও আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার চাওয়া একটাই, শুটার শামীমসহ এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেক আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আমাকে যারা স্বামীহারা করেছে, নিজের চোখে দেখে যেতে চাই। আমি তাদের ফাঁসি চাই।’
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘মামলার তদন্ত অনেক দূর এগিয়েছে। হত্যাকাণ্ডে আর কারা জড়িত, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। আশা করছি, দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পারব। এরপর সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে।’