খেলাপি ৭২৪০ কোটি টাকা কমানোর প্রতিশ্রুতি

০৩ নভেম্বর ২০২০, ০৭:৫৮ এএম | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২০, ০৫:১৩ পিএম


খেলাপি ৭২৪০ কোটি টাকা কমানোর প্রতিশ্রুতি
ছবি সংগৃহীত

ব্যাংকিং খাতে আর্থিক অবস্থা শক্তিশালী করতে ২০২৩ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬টি ব্যাংকের সোয়া ৭ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কমানো হবে। অর্থাৎ এ টাকা খেলাপিদের কাছ থেকে আদায় করা হবে। এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি করেছে।

ব্যাংকগুলোর মতে, খেলাপি ঋণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধির কারণে মূলধন সংকট সৃষ্টির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী মূলধন পর্যাপ্ততার হার সঠিক পর্যায়ে রাখা যাচ্ছে না। এর আগের তিন বছরে (২০১৭-২০১৯) রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ কমিয়েছে ৬ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্য নির্ধারণ করা ভালো। তবে এটি অর্জন করতে পারলে পুরস্কার আর ব্যর্থতায় তিরস্কারের বিষয়টি যোগ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক ধরনের চাপ আসবে। রাজনৈতিক চাপও আসবে। এই চাপমুক্ত থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করতে পারলে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি অর্জন সম্ভব হবে। পাশাপাশি এ কাজের মনিটরিংও করতে হবে।

জানা গেছে, ব্যাংকিং খাতে প্রধান চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণ। এর পরিমাণ কমিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কারণ বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতির বড় অন্তরায় খেলাপি ঋণ। এই ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকিং খাতে আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আগামী দিনে খেলাপির পরিমাণ যাতে না বাড়ে, এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া আছে ব্যাংকগুলোয়।

সূত্রমতে, সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে একটি চুক্তি করেছে। ওই চুক্তির প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায় ও স্থিতি নিয়ে আগামী তিন বছরের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। ব্যাংকগুলো নিজ অবস্থান থেকে কী পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমাবে, এর ঘোষণা সেখানে দিয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আগামী তিন বছরে খেলাপি ঋণ ৭ হাজার ২৪০ কোটি টাকা কমিয়ে আনার রূপরেখার মধ্যে চলতি অর্থবছরে করা হবে ১ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। আর আগামী অর্থবছরে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং পরবর্তী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৩ হাজার ৩৫ কোটি টাকা।

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ডিসেম্বর পর্যন্ত হিসাবে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসেবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৪০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) হিসেবে প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কর্মসম্পাদন চুক্তিতে বলা হয়, খেলাপি ঋণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এ কারণে প্রভিশন ও মূলধনের পর্যাপ্ততা সঠিক মানে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য আগামী দিনে অধিক পরিমাণ ভালো ঋণ দেয়া হবে। পাশাপাশি নগদ আদায়ের পরিমাণ বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ন্যূনতম পর্যায়ে কমিয়ে আনা হবে। সেখানে ব্যাংকিং খাতের আর্থিক অবস্থা শক্তিশালী করতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।

চুক্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, চলতি অর্থবছরে সোনালী ব্যাংক ৪৫০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আর আগামী অর্থবছরে ৮০০ কোটি টাকা এবং পরবর্তী অর্থবছরে এক হাজার কোটি টাকা। একইভাবে অগ্রণী ব্যাংক এই অর্থবছরে ৪০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কমাবে।

আগামী ও পরবর্তী অর্থবছরে যথাক্রমে হ্রাস করবে ৫০০ ও ৫৫০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ৪৫০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জনতা ব্যাংক। আর আগামী অর্থবছরে ৮০০ কোটি টাকা এবং পরবর্তী অর্থবছরে এক হাজার কোটি টাকা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে ব্যাংকটি।

এছাড়া রূপালী ব্যাংক চলতি অর্থবছরে ১৪০ কোটি টাকা ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে আদায় করবে। আর আগামী অর্থবছরে ২০০ কোটি টাকা এবং এর পরবর্তী বছরে আদায় করা হবে ২৫০ কোটি টাকা। এছাড়া ২০২০-২০২৩ সাল পর্যন্ত তিন অর্থবছরে বেসিক ব্যাংক যথাক্রমে ১২৫ কোটি, ১৫০ কোটি ও ১৭৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

আর ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া আগামী অর্থবছরে ৫০ কোটি টাকা এবং পরবর্তী বছরে ৬০ কোটি টাকা হ্রাস করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বিভিন্ন আইনের সংস্কার করা হচ্ছে। কারণ ইতঃপূর্বে বিভিন্ন সময়ে খেলাপি ঋণ হ্রাস এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে এর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি।

তবে ব্যাংকিং খাতে বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আইনি সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং ব্যবসায়িক প্রভাব রয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতায় ঘাটতি রয়েছে।

সূত্র: যুগান্তর


বিভাগ : অর্থনীতি