সারাবিশ্ব
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ২২৫ কোটি ডলার সমমূল্যের ৪৫টি রিপার ড্রোন হারিয়েছে
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৪৫টি এমকিউ-৯ ‘রিপার’ ড্রোন হারিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। হারানো ড্রোনের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট রিপার বহরের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য ব্যবহৃত হয় রিপার ড্রোন। মার্কিন বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সেন্সর ও অস্ত্রের ধরনভেদে প্রতিটি ড্রোনের মূল্য প্রায় ৩ কোটি থেকে ৫ কোটি ডলার। ফলে ৪৫টি রিপার হারিয়ে শুধু ড্রোনের ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩০ কোটি থেকে ২২৫ কোটি ডলার।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালির আশপাশে এসব ড্রোন ব্যাপকভাবে মোতায়েন করা হয়েছে। সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি বর্তমানে উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
তবে সব রিপার ড্রোন ইরানি বা মিত্র বাহিনীর গুলিতে ভূপাতিত হয়নি বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। কয়েকটি ড্রোনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সেগুলো বিধ্বস্ত হয়েছে।
রিপার তুলনামূলক ধীরগতির এবং অনেক সময় নিচু উচ্চতায় উড়ে থাকে। এ কারণে ইরানের সামরিক বাহিনী ছাড়াও ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের কাছে এগুলো তুলনামূলক সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি ইউক্রেনকে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতেও চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের প্রথম মাসেই মার্কিন বাহিনী ৮৫০টির বেশি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং এক হাজারের বেশি প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
এর ফলে দীর্ঘপাল্লার হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মজুত কমে যাওয়ায় আঞ্চলিক মার্কিন কমান্ডাররা সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করছেন। কোনো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের আশঙ্কা কম মনে হলে সেটি প্রতিহত না করে কিছু প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
পেন্টাগন অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর নিয়মিতভাবেই এ ধরনের ঘাটতির খবর অস্বীকার করে আসছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে প্রায় ১৮৫টি রিপার ড্রোন ছিল। এর মধ্যে বিমানবাহিনীর ১৬৫টি এবং মেরিন কোরের ২০টি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যবহৃত রিপার এই হিসাবের বাইরে।
মেরিন কোরের কোনো রিপার এখনো হারায়নি বলে জানিয়েছেন বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল জোশুয়া বেনসন।
এর আগে মে মাসে বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডেভিড ট্যাবর সিনেটে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা রিপারের সংখ্যা তখন প্রায় ১৩৫টিতে নেমে এসেছিল। তিনি দ্রুত ড্রোন বহর পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছিলেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে জেনারেল অ্যাটমিকসের তৈরি রিপারের ব্যবহার কমানোর পরিকল্পনা করছে। এর পরিবর্তে কম খরচের নতুন ধরনের সশস্ত্র নজরদারি ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ড্রোন একসঙ্গে ‘ঝাঁক’ তৈরি করে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারবে।
ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটানো এবং কমে যাওয়া অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত অর্থ চেয়েছে। প্রশাসন প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বাজেট অনুমোদনের চেষ্টা করছে।
পেন্টাগনের অস্ত্রভান্ডার দ্রুত পুনরায় পূরণ করতে এই অর্থ প্রয়োজন বলে দাবি করছে প্রশাসন। তবে অর্থ বরাদ্দ হলেও ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত এবং ইউক্রেনকে সরবরাহ করা অস্ত্রের কারণে কমে যাওয়া মজুত পুরোপুরি পূরণ করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, দ্রুত অতিরিক্ত অর্থ না পেলে ইরান যুদ্ধের কারণে প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর তৈরি বাড়তি চাপ সামলাতে সামরিক প্রশিক্ষণ কমানোর প্রয়োজন হতে পারে। তাঁর হিসাবে, সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ যুদ্ধের ব্যয় ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পুনর্নির্মাণের ব্যয় এতে ধরা হয়নি।
রক্ষণশীল থিংকট্যাংক আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (AEI) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন মিসাইল ডিফেন্স এজেন্সি বছরে সর্বোচ্চ ৯৬টি থাড ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতে পারে। বিপরীতে আগামী বছরের প্রতিরক্ষা বাজেটে পেন্টাগন ৮৫৭টি এবং আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২ হাজার ৬০০টি থাড চেয়েছে।
বর্তমান উৎপাদনক্ষমতা অপরিবর্তিত থাকলে এই চাহিদা পূরণে প্রায় ২৭ বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে AEI।
প্রতিবেদনটির লেখক ও প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ফেলো টড হ্যারিসনের ভাষ্য, একটি থাড ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতেই প্রায় তিন বছর সময় লাগে। ফলে এখন অর্ডার দিলেও সরবরাহ পেতে পেতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যেতে পারে।
এদিকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের উৎপাদন বাড়াতে পেন্টাগন কয়েকটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ‘ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি’ নিশ্চিত করেছে। তবে উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত অর্থায়ন বা চুক্তি এখনো সম্পন্ন হয়নি।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।