সারাবিশ্ব

গলছে বরফ, ঝুঁকিতে সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার নানা অবকাঠামো


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম

গলছে বরফ, ঝুঁকিতে সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার নানা অবকাঠামো
ছবি: সংগৃহীত

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার প্রাকৃতিক পরিবেশ। গলে যাচ্ছে হাজার বছরের পুরোনো বরফ, সংকুচিত হচ্ছে হিমবাহ এবং অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি। এর ফলে পাথরধস, ভূমিধস ও তুষারধসের ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি বিপদের মুখে পড়েছে আল্পসের বিভিন্ন পার্বত্য অবকাঠামো। বিশেষ করে সুইস আল্পাইন ক্লাবের (এসএসি) পরিচালনাধীন পাহাড়ি কুটিরগুলোর একটি বড় অংশ এখন হুমকির মুখে রয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুইস আল্পাইন ক্লাবকে ঝুঁকিপূর্ণ কুটির নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ এবং সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সুইস ইনফোর এক প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আল্পস অঞ্চলের অবকাঠামো ও পর্যটন ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া এই সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

ঝুঁকিতে আল্পাইনের ৬৫টি কুটির

সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালাজুড়ে সুইস আল্পাইন ক্লাবের পরিচালনায় রয়েছে মোট ১৫২টি পাহাড়ি কুটির। এর মধ্যে অন্তত ৬৫টি এমন এলাকায় অবস্থিত, যেখানে গলতে থাকা পারমাফ্রস্টের কারণে ভূমির স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়েছে। পারমাফ্রস্ট হলো এমন মাটি বা শিলাস্তর, যা অন্তত টানা দুই বছর হিমায়িত অবস্থায় থাকে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এই বরফমিশ্রিত মাটি ও শিলাস্তর গলতে শুরু করলে পাহাড়ের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। ফলে ভবন, পাহাড়ি পথ এবং অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

শুধু পাহাড়ি কুটির নয়, আল্পসের বিভিন্ন যাতায়াতের পথও ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। পাথরধস, কাদাধস এবং পাহাড়ের মাটি ও শিলার স্থানচ্যুতির কারণে অনেক পথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এতে পর্বতারোহী, পর্যটক ও উদ্ধারকর্মীদের চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে।

ফাটলের কারণে বন্ধ হয় মুথর্ন পাহাড়ি কুটির

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিপদের বাস্তব উদাহরণ বার্নিজ ওবারল্যান্ড অঞ্চলের মুথর্ন পাহাড়ি কুটির। দীর্ঘদিন ধরে কুটিরটির দেয়াল ও কাঠামোতে ফাটল দেখা দিচ্ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ফাটল আরও প্রশস্ত হতে থাকে। আশপাশের বরফ গলে যাওয়া এবং ভূমির স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ায় কুটিরটি ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ২০২১ সালে এটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সুইস পাবলিক ব্রডকাস্টার আরটিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুইস আল্পাইন ক্লাবের ওয়াইসেনস্টাইন শাখার সভানেত্রী ফ্যাভিয়েন নোটার বলেন, তাঁরা জানতেন কুটিরটি হয়তো আরও ১০০ বছর টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু এত দ্রুত এটি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে, তা তাঁদের সত্যিই আতঙ্কিত করেছে।

এই ঘটনা আল্পস অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা দ্রুত অবকাঠামোর নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে তুলছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কখন ধস নামবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না

পাহাড়ের ভূপ্রকৃতির পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও। বার্ন ক্যানটনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিভাগের প্রধান নিলস হেলেনের ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড়ের কোন অংশ কখন ধসে পড়বে কিংবা কখন বড় কোনো শিলাখণ্ড নিচে নেমে আসবে, তা আগাম নির্ভুলভাবে অনুমান করা কঠিন। তবে যেসব এলাকায় ভূমির স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে, সেখানে ধসের ঝুঁকি বাস্তব এবং তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে পারমাফ্রস্টের গলন। দীর্ঘদিন ধরে জমাট থাকা বরফ পাহাড়ের শিলাস্তরকে একত্রে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাপমাত্রা বেড়ে সেই বরফ গলে গেলে শিলাস্তর দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে পাথর ভেঙে পড়া, ভূমিধস এবং পাহাড়ি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ে।

দ্রুত পাতলা হচ্ছে অ্যালেশ হিমবাহ

আল্পস অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে অ্যালেশ হিমবাহে। হিমবাহটি প্রতিবছর প্রায় চার থেকে ছয় মিটার পর্যন্ত পুরুত্ব হারাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বরফ গলে হিমবাহের উচ্চতা কমে যাওয়ায় সেখানে চলাচলের জন্য ব্যবহৃত সিঁড়ি ও পথ বারবার পরিবর্তন করতে হচ্ছে। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রতি দুই থেকে তিন বছর পরপর এসব সিঁড়ি বা চলাচলের পথ বাড়ানোর প্রয়োজন হচ্ছে।

হিমবাহের বরফ গলে যাওয়া শুধু পাহাড়ের আকৃতি ও পর্যটন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে না, পানির প্রাপ্যতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে। আল্পসের অনেক পাহাড়ি কুটিরে দৈনন্দিন কাজের জন্য বরফ গলা পানি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু বরফের পরিমাণ কমে গেলে এসব কুটিরে পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

কুটির ব্যবস্থাপক ক্রিস্তোফ সেগার পানির ভবিষ্যৎ প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বরফ গলা পানি আর পাওয়া না গেলে বর্তমানে যে পরিমাণ পানি মজুত রয়েছে, তা দিয়েই পরবর্তী মে মাস পর্যন্ত চলতে হবে। তাঁর এই বক্তব্য পাহাড়ি অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া পানির অনিশ্চয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

৯০০ মিটার দূরে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন কুটির

ঝুঁকি মোকাবিলায় মুথর্ন কুটিরের পরিবর্তে একটি নতুন কুটির নির্মাণ করা হয়েছে মূল স্থাপনা থেকে প্রায় ৯০০ মিটার দূরে। নতুন স্থানটি তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল এবং তুষারধসের ঝুঁকিও সেখানে কম বলে বিবেচনা করা হয়েছে। পুরোনো কুটিরটির অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় নিরাপদ স্থানে নতুন স্থাপনা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নতুন কুটির নির্মাণের পর ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে পুরোনো কুটিরটি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা হয়। এ কাজে ব্যয় হয়েছে চার লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি। এই ব্যয় শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে ফেলার বিষয় নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাহাড়ি অবকাঠামোকে নিরাপদ রাখার ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপেরও প্রতিফলন।

সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব শুধু হিমবাহ গলে যাওয়া বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ছে পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি, পর্যটন, যোগাযোগব্যবস্থা, পানির সরবরাহ এবং মানুষের নির্মিত অবকাঠামোর ওপরও। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো স্থানান্তর, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে আরও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।