অপরাধ

বাবাকে ভিডিও কলে নির্যাতনের কথা জানান বর্ষা, হাসপাতালে গিয়ে মিলল মৃত্যুর খবর


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম

বাবাকে ভিডিও কলে নির্যাতনের কথা জানান বর্ষা, হাসপাতালে গিয়ে মিলল মৃত্যুর খবর
ছবি: সংগৃহীত

স্বামীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে গভীর রাতে বাবাকে ভিডিও কল করে উদ্ধারের আকুতি জানিয়েছিলেন জুমরাতুন নেছা বর্ষা (২৪)। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বারবার বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন তিনি। এমনকি তাঁকে ওই বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া না হলে মেরে ফেলা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ভিডিও কলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর মেয়ের খোঁজ নিতে ছুটে যান মা-বাবা। বাসার সামনে গিয়ে দেখতে পান একটি অ্যাম্বুলেন্স। পরে হাসপাতালে পৌঁছে জানতে পারেন, তাঁদের আদরের মেয়ে আর বেঁচে নেই। বর্ষার মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারটির অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যৌতুকের দাবিতে তাঁকে নির্যাতন করতেন তাঁর স্বামী।

গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) মধ্যরাতে রাজধানীর মণিপুরিপাড়ার একটি বাসায় এ ঘটনা ঘটে। পরে বর্ষাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় বর্ষার বাবা শেখ মনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা করেছেন। তিনি ঢাকার লালবাগের স্থায়ী বাসিন্দা।

বর্ষার চাচা শেখ জাকির হোসেন জানান, প্রায় এক বছর আগে ভালোবেসে নাবিদ হোসাইনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বর্ষার। তাঁর অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই নাবিদ কোনো কাজ না করে বিভিন্ন সময় শ্বশুরের কাছে টাকা চাইতেন। বর্ষার পরিবারও আগে কয়েক দফায় তাঁকে টাকা দিয়েছিল। তবে টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। এ সময় বর্ষাকে মারধর করা হতো বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একপর্যায়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে বর্ষাকে হাসপাতালে চিকিৎসাও নিতে হয়েছিল। তবে পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি এসব ঘটনার বিস্তারিত জানাতেন না বলে দাবি স্বজনদের।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে শেখ জাকির হোসেন বলেন, মঙ্গলবার আবারও তাঁর ভাইয়ের কাছে টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বর্ষাকে মারধর করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শ্বশুরবাড়ির একজন ওই নির্যাতনের দৃশ্য ধারণ করে বর্ষার পরিবারের কাছে পাঠান। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে রাত ১২টার দিকে বাবাকে ভিডিও কল করেন বর্ষা। এ সময় তাঁকে কান্নাকাটি করতে দেখা যায়। বারবার বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁকে ওই বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া না হলে মেরে ফেলা হতে পারে। কিন্তু কথা বলার একপর্যায়ে ভিডিও কলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ভিডিও কল বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বর্ষার মা-বাবা। তাঁরা দ্রুত মণিপুরিপাড়ায় মেয়ের বাসার উদ্দেশে রওনা হন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে সেখানে পৌঁছে বাসার সামনে একটি অ্যাম্বুলেন্স দেখতে পান। পরে বর্ষার শ্বশুরের কাছে জানতে চাইলে তাঁদের বলা হয়, বর্ষা আত্মহত্যা করেছেন এবং তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

এরপর দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান বর্ষার মা-বাবা। তবে তখনো তাঁরা জানতেন না, তাঁদের মেয়ে মারা গেছেন। হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স থেকে বর্ষাকে নামানোর সময় তাঁরা তাঁকে ডাকাডাকি করতে থাকেন। পরে কর্তব্যরত নার্সরা পরীক্ষা করে বর্ষার মৃত্যুর বিষয়টি জানান। মুহূর্তেই স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।

এ বিষয়ে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুনিরুজ্জামান জানান, যৌতুকের দাবিতে বিভিন্ন সময় বর্ষাকে মারধর করতেন তাঁর স্বামী নাবিদ হোসাইন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্ষার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় তাঁর বাবা বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন। পরে হাসপাতাল থেকে নাবিদকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে তদন্ত চলছে বলে জানান তিনি।

এদিকে বর্ষার স্বজনদের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকে ব্যবসা শুরু করা এবং মোটরসাইকেল কেনার কথা বলে শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য বর্ষাকে চাপ দিতেন নাবিদ। মেয়ের সংসারের কথা বিবেচনা করে বর্ষার বাবা কয়েকবার টাকা দিলেও পরে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয় পরিবার। স্বজনদের দাবি, নাবিদ ওই টাকা মাদক সেবনে ব্যয় করতেন। টাকা দেওয়া বন্ধ হওয়ার পর বর্ষার ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায় বলেও অভিযোগ তাঁদের।

স্বজনদের ভাষ্য, নির্যাতনের শিকার হলেও বর্ষা সব সময় পরিবারের সদস্যদের কাছে তা প্রকাশ করতেন না। ঘটনার দিন বাবাকে ভিডিও কলে তাঁর আকুতি এবং পরে হাসপাতালে গিয়ে মৃত্যুর খবর পাওয়ার ঘটনা পরিবারকে গভীর শোকের মধ্যে ফেলেছে। তবে বর্ষার স্বজনদের তোলা অভিযোগের বিষয়ে নাবিদের পরিবারের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, মামলাটির তদন্ত চলছে। তদন্তের মাধ্যমে বর্ষার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।