সারাদেশ

টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে মৃত্যু, একসঙ্গে স্বামী-স্ত্রী ও দুই সন্তানকে দাফন


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৬ পিএম

টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে মৃত্যু, একসঙ্গে স্বামী-স্ত্রী ও দুই সন্তানকে দাফন
ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো একই পরিবারের চার সদস্যকে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। যশোরের মনিরামপুরে মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজী এবং তাঁদের দুই শিশুকন্যা। বুধবার (২৮ অক্টোবর) তাঁদের দাফনকে কেন্দ্র করে মনিরামপুর পৌরসভার মোহনপুর গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকার পরিবেশ।

নিহত চারজনের মরদেহ বুধবার সকাল ৭টার দিকে তাঁদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয়জনদের মরদেহ ফিরে পেলেও পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না স্বজন ও প্রতিবেশীরা। পরে বিকেল ৩টার দিকে মোহনপুরের বাঁধাঘাট মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে একই সঙ্গে চারজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাঁদের নাহিদুর রহমানের মায়ের কবরের পাশে পাশাপাশি দাফন করা হয়। একই পরিবারের চার সদস্যের এমন মর্মান্তিক বিদায়ে শোকাহত হয়ে পড়েন উপস্থিত সবাই।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিরা হলেন নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজী (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৭) ও মুনাইনা ইহানা (৩)। পরিবারের চার সদস্যের একসঙ্গে এমন মৃত্যুতে স্বজনদের মধ্যে শোকের মাতম চলছে। বিশেষ করে দুই শিশুর নিষ্পাপ মুখ আর পরিবারের স্বাভাবিক জীবনের স্মৃতি মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

নাহিদুর রহমানের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স জানান, গত ১৭ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তাঁর ছোট ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিখোঁজ ছিলেন। ওই দিনই রিসোর্টের একটি ওয়াশরুম থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহগুলো তাঁদের স্বজনদের বলে ধারণা করা হলেও আগুনে পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে তাঁদের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

নাহিদুর রহমানের চাচাতো ভাই খালিদ হোসেন জানান, দীর্ঘ ১০ দিন পর মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে চারজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানসহ প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাফন ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের জন্য নিহতদের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

নিহত নাহিদুর রহমানের বাবা মতিয়ার রহমানের বয়স আশির বেশি। ছেলেসহ পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে তিনি শোকে ভেঙে পড়েছেন। তিনি জানান, তাঁর স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। ২০১৬ সালে ছেলে নাহিদের কোলে মাথা রেখেই তিনি মারা যান। এত বছর পর সেই স্ত্রীর কবরের পাশেই পাশাপাশি দাফন করা হলো তাঁর ছেলে নাহিদ, পুত্রবধূ আফসানা এবং দুই নাতনিকে। জীবনের এমন নির্মম পরিণতি মেনে নেওয়া তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে আগে থেকেই চারটি কবর খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রস্তুতি যে এতটা হৃদয়বিদারক বিদায়ের জন্য, তা মেনে নেওয়া ছিল স্বজনদের জন্য অসহনীয়। বুধবার সকালে একে একে চারটি মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলেন প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরাও।

একটি অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিল একই পরিবারের চারটি প্রাণ। মায়ের কবরের পাশে পাশাপাশি চারটি নতুন কবর যেন রেখে গেল এক পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও স্মৃতির করুণ অধ্যায়। মনিরামপুরের মোহনপুর গ্রামে এখন শোকের আবহ-যেখানে স্বজনদের চোখের পানি আর প্রিয়জন হারানোর বেদনা মিলেমিশে একাকার।