সারাবিশ্ব

লুলার কাছে নির্বাচনে হেরে ব্রাজিল ছেড়েছেন ইসরায়েলপন্থি প্রার্থী ফ্লাভিও


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম

লুলার কাছে নির্বাচনে হেরে ব্রাজিল ছেড়েছেন ইসরায়েলপন্থি প্রার্থী ফ্লাভিও
ছবি: সংগৃহীত

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে পরাজয়ের পর কট্টর ডানপন্থি সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো দেশ ছেড়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন এবং সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে পারেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট লুলা।

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম মেত্রোপোলেস বলসোনারো পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ফ্লাভিও বলসোনারো যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন। তাঁদের দাবি, তাঁর বহনকারী বিমানটি ইতোমধ্যে আকাশে রয়েছে। বলসোনারোর কয়েকজন মিত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেলে তাঁর ফ্লোরিডায় পৌঁছানোর কথা ছিল। সেখানে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে পারেন বলেও দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, ফ্লাভিও বলসোনারো তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেন। পরে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাঁরা ইকুয়েডরের উদ্দেশে একটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে ওঠেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আর্জেন্টিনার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, তাঁদের প্রবেশের ক্ষেত্রে বৈধ কাগজপত্র ছিল এবং কোনো আইনি বাধা ছাড়াই তাঁদের যাতায়াতের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়।

ব্রাসিলিয়ায় নিজের ৮১তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ফ্লাভিওর দেশত্যাগের খবরের সমালোচনা করেন লুলা। তিনি বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে কটাক্ষ করেন। লুলার বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনে পরাজয়ের পর এভাবে দেশ ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তিনি এ ঘটনাকে লজ্জাজনক বলেও মন্তব্য করেন।

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ফোলহা দে সাও পাওলোর প্রতিবেদনেও ফ্লাভিওর যুক্তরাষ্ট্রযাত্রার খবর তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের বরাত দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশত্যাগের পরিকল্পনাটি বলসোনারো পরিবারের ঘনিষ্ঠ একজন আইনজীবীর মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়েছিল। এদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্রের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বলসোনারো ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য ভিসা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। এসব তথ্যের স্বাধীন ও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ প্রয়োজন।

এর আগে অর্থ পাচারের অভিযোগসংক্রান্ত একটি তদন্তের প্রেক্ষাপটে ফ্লাভিওর পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর তাঁর দেশত্যাগের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরপরই সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতি তাঁর পাসপোর্ট বাতিল করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ ও আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালত এবং কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই করা জরুরি।

এদিকে, লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির আইনপ্রণেতারা ফ্লাভিওকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর নাম ইন্টারপোলের রেড নোটিশ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আবেদন দাখিল, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং ইন্টারপোলের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না-এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

ফ্লাভিওর দেশত্যাগের খবর ব্রাজিলের কট্টর ডানপন্থি রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাঁর বাবা জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টার অভিযোগ এবং তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের অবস্থান ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন দাবি প্রকাশিত হয়েছে।

ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব মিনাস রাইসের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাগনা ইনাসিওর বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ পরিস্থিতি ব্রাজিলের ডানপন্থি শিবিরে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, কট্টর ডানপন্থি রাজনীতির প্রতি ভোটারদের মনোভাব ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিভিন্ন মতামত ও নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, ব্রাসিলিয়ায় ফ্লাভিওর প্রচারণার দায়িত্বে থাকা সিনেটর রোজেরিও মারিনহো তাঁর দেশত্যাগের খবর শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগের দিনও ফ্লাভিওর সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল যে নির্বাচনে পাওয়া ভোটের ভিত্তিতে বিরোধী দলের নেতৃত্বে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা পালন করা উচিত। বিদেশে অবস্থান করে তিনি বিরোধী দলের নেতৃত্ব দিতে পারবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মারিনহো ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর উদাহরণ টানেন।

সব মিলিয়ে, ফ্লাভিও বলসোনারোর দেশত্যাগ, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার সম্ভাবনা এবং তাঁর বিরুদ্ধে কথিত আইনি পদক্ষেপের খবর ব্রাজিলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে ঘটনাগুলোর সত্যতা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং নির্বাচনের ফলাফল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এসব তথ্যকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উত্থাপিত দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।