সারাবিশ্ব
নির্বাচনে অস্বাভাবিক ভোটার উপস্থিতি, নেতানিয়াহু বললেন-‘ইহুদি রাষ্ট্র ঝুঁকির মুখে’
ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সমর্থকদের দ্রুত ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক বার্তায় তিনি দাবি করেছেন, নেগেভ অঞ্চলে আরব ভোটারদের উপস্থিতির হার ইহুদি ভোটারদের তুলনায় অনেক বেশি। তাঁর ভাষ্য, এ পরিস্থিতি ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। তবে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে করা এসব দাবির পক্ষে তিনি কোনো পরিসংখ্যানগত উৎস উল্লেখ করেননি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দ্য টাইমস অব ইসরায়েল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বার্তা দিচ্ছেন নেতানিয়াহু। নিজের দল লিকুদের সমর্থকদের উদ্দেশে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘আপনাদের অবশ্যই ভোট দিতে যেতে হবে।’ এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিপক্ষরা তাঁদের কাছ থেকে নির্বাচন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ দল রা’আমের তিনজন জ্যেষ্ঠ নেতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি দাবি করেন, ভোটারদের ঘুষ দেওয়ার সন্দেহে অর্থভর্তি খামসহ তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সমর্থকদের উদ্দেশে নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘বিষয়টি গুরুতর। এটি একটি অপরাধ।’ তাঁর দাবি, প্রতিপক্ষরা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। তাই সমর্থকদের দ্রুত ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। নেতানিয়াহু বলেন, এখন সমুদ্রসৈকতে যাওয়া কিংবা বারবিকিউ করার সময় নয়; বরং সবাইকে ভোট দিতে বেরিয়ে আসতে হবে এবং লিকুদ পার্টিকে সমর্থন জানাতে হবে।
নেতানিয়াহু তাঁর বক্তব্যে ইসরায়েলের রাষ্ট্রপরিচয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ইহুদি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এখন ঝুঁকির মুখে।’ তাঁর দাবি, বিরোধী জায়নবাদী ও আরব দলগুলো নির্বাচনে জয়ী হলে বর্তমানে পরিচিত ইহুদি রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি আরও দাবি করেন, বামপন্থি ও আরব ভোটারদের মধ্যে ভোট দেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে, অথচ ডানপন্থি ভোটারদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম।
নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন তাঁর দল লিকুদের পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভও। নাম উল্লেখ না করে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ব্যক্তি নির্বাচন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে রেগেভ বলেন, তাঁরা নির্বাচন ও দেশ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি বক্তব্যে ডানপন্থি শক্তি ও ফিলিস্তিনপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব তুলে ধরেন।
এদিকে ইসরায়েলের অতি-ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও আরব সম্প্রদায়ের ভোটার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আরব শহর কাফর কাসেম থেকে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি সমর্থকদের তাঁর দল ওতজমা ইহুদিৎকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটার উপস্থিতির ‘পাগলাটে হার’ মোকাবিলার কথা বলেন তিনি।
বেন-গভির বলেন, এখন দায়িত্ব ভোটারদের হাতে। ইসরায়েলকে ইহুদি ও জায়নবাদী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাইলে সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ দল রা’আমের নেতা মানসুর আব্বাস এবং জয়েন্ট লিস্টের সদস্য আহমদ তিবির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে প্রতিদ্বন্দ্বী আরব রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি উঠে আসে।
নেতানিয়াহু ও তাঁর সমর্থকদের এসব বক্তব্যের জবাবে গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার দল পাল্টা অভিযোগ করেছে। দলটির দাবি, নির্বাচনে কারচুপির প্রমাণ উপস্থাপন না করেই নেতানিয়াহু ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর এবং নির্বাচনের ফলাফলের ওপর জনসাধারণের আস্থা দুর্বল করার চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ইয়াশার এক বিবৃতিতে বলা হয়, নেতানিয়াহু আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এবং নির্বাচন চুরির অভিযোগ তুলে বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন। দলটির দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক তৈরির একটি প্রচেষ্টা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি।
নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করতে লিকুদের বিরুদ্ধে আরও বেশি ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইয়াশা। দলটির ভাষ্য, ব্যবধান যত বড় হবে, ফলাফল নিয়ে বিতর্ক তৈরির সুযোগ তত কমবে। বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচনে এমন বিশাল ব্যবধান তৈরি করতে হবে, যা কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করা সম্ভব হবে না।
সব মিলিয়ে ভোটার উপস্থিতি, আরব সম্প্রদায়ের ভোট এবং নির্বাচনে কারচুপির পাল্টাপাল্টি অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একদিকে নেতানিয়াহু ও তাঁর সমর্থকেরা ডানপন্থি ভোটারদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন, অন্যদিকে বিরোধীরা এসব বক্তব্যকে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আগাম বিতর্ক তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে। তবে ভোটার উপস্থিতি কিংবা নির্বাচনে অনিয়মের বিষয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ও যাচাই করা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।