রাজধানী
মেট্রোরেলে স্ট্রোকের পরও সিটে বসতে দেয়নি কেউ, মুহূর্তে লুটিয়ে পড়ে মৃত্যু
মেট্রোরেলে যাতায়াতের সময় অসুস্থ হয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহা. নজীবুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায় সহযাত্রীদের মানবিক আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর ছেলে ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সদস্য নাকিবুর রহমান। তাঁর অভিযোগ, অসুস্থ বোধ করায় মেট্রোরেলের ভেতরে বসতে চেয়েছিলেন তাঁর বাবা। তবে আশপাশের কেউ তাঁকে বসার জন্য আসন ছেড়ে দেননি। পরে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি হঠাৎ মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়।
গত ২৪ অক্টোবর দুপুরে শাহবাগ থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া স্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক পোস্টে বাবার মৃত্যুর ঘটনা তুলে ধরেন নাকিবুর রহমান। একই সঙ্গে চলাফেরার সময় বয়স্ক ও প্রবীণ নাগরিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও বন্ধুসুলভ আচরণ করার আহ্বান জানান তিনি।
ফেসবুক পোস্টে নাকিবুর রহমান লেখেন, গত ২৪ অক্টোবর দুপুরে মেট্রোরেলে শাহবাগ থেকে উত্তরা ফেরার পথে শেওড়াপাড়া স্টেশনের কাছাকাছি তাঁর বাবা স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং মুহূর্তের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন। অসুস্থ বোধ করায় তিনি আশপাশের যাত্রীদের কাছে বসার জন্য জায়গা চেয়েছিলেন। কিন্তু কেউ তাঁকে আসন ছেড়ে বসতে দেননি বলে অভিযোগ করেন নাকিবুর।
তিনি আরও লেখেন, তাঁর বাবা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় স্ট্রোক করে নিচে পড়ে যান। আল্লাহ তাঁর মৃত্যুকে সহজ করে দিয়েছেন। কিন্তু সন্তান হিসেবে এই ঘটনা মেনে নেওয়া তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। এ ঘটনায় কারও প্রতি রাগ বা অভিমান নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নাকিবুর রহমান তাঁর পোস্টে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, চলাফেরার সময় যেখানেই কোনো বয়স্ক বা প্রবীণ নাগরিককে দেখা যাবে, তাঁদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করা উচিত। আজ যাঁকে কেউ উপেক্ষা করছেন, তিনি নিজের বাবা না হলেও অন্য কারও বাবা হতে পারেন। তাই বয়স্ক মানুষের অসুবিধা বুঝে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনে সহযোগিতা করা সবার মানবিক দায়িত্ব।
একই সঙ্গে মেট্রোরেলে যাতায়াতের নিয়মকানুন কিংবা এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাউকে দোষারোপ করে মন্তব্য না করার অনুরোধ জানান তিনি। তাঁর মতে, যাতায়াতের সময় আশপাশের মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য ও শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাবার মৃত্যুর পর অনেকের ফোন ও বার্তার উত্তর দিতে পারেননি জানিয়ে পর্যায়ক্রমে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চান।
ঘটনার বিস্তারিত যেভাবে জানালেন ছেলে
ঘটনার বিষয়ে সংবাদমাধ্যম কালবেলাকে নাকিবুর রহমান জানান, তাঁদের বাসা রাজধানীর উত্তরায়। গত ২৪ অক্টোবর তাঁর বাবার অফিস বন্ধ ছিল। সকালে তিনি বাবাকে বাসায় দেখে বের হন। পরে সহকর্মীদের সঙ্গে একটি বৈঠকে অংশ নিতে তাঁর বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। দুপুরে সেখান থেকে ফেরার পথে মেট্রোরেলে শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়ার মধ্যবর্তী স্থানে তিনি অসুস্থ বোধ করেন।
নাকিবুরের ভাষ্য অনুযায়ী, অসুস্থতা অনুভব করার পর তাঁর বাবা বসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ সময় কেউ তাঁকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেননি বলে তিনি অভিযোগ করেন। একপর্যায়ে তাঁর বাবা হঠাৎ মেট্রোরেলের ভেতরে পড়ে যান এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা যান।
নাকিবুর আরও জানান, তাঁর বাবার এক সহকর্মী, যিনি পেশায় চিকিৎসক, ওই সময় মেট্রোরেলে উঠেছিলেন। তিনি এগিয়ে এসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিকভাবে বুঝতে পারেন যে তাঁর বাবা আর বেঁচে নেই। পরে তাঁকে উত্তরা উত্তর স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। মেট্রোরেলটি স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। বাবার অপর এক সহকর্মীর মাধ্যমে খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান নাকিবুর।
বাবার শেষ সময়ে পরিবারের কেউ তাঁর পাশে থাকতে না পারার আক্ষেপও তুলে ধরেন নাকিবুর রহমান। তিনি জানান, তাঁর মা ও ছোট ভাই তখন ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। তাঁদের দেশে ফেরার কোনো টিকিট ৩১ অক্টোবরের আগে পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁরা বাবাকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগও পাননি বলে জানান তিনি।
কে ছিলেন ড. মুহা. নজীবুর রহমান
ড. মুহা. নজীবুর রহমান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। তিনি রাজধানীর উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরে বসবাস করতেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি বরিশালের গৌরনদী এলাকায়। জানাজা শেষে তাঁকে গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণপরিবহনে বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের প্রতি সহমর্মিতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহযোগিতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে মেট্রোরেলের ভেতরে ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং যাত্রীরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এখানে উল্লেখ নেই। তাই বিষয়টি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ঘটনার সব দিক যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।