রাজনীতি
‘সাপ নিয়ে নাড়াচাড়া করবেন না, ছোবল দিয়ে শেষ করে দেবে’
আওয়ামী লীগের মধ্যে যারা ভালো মানুষ ও দেশপ্রেমিক, তাঁদের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী রাজনৈতিক ঠিকানা খুঁজে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে দেশে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানের আশঙ্কা দেখিয়ে কাউকে ভয় দেখানোর চেষ্টা না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে-এমন কল্পনা কেউ করবেন না। জুজুর ভয় আমাদের দেখাবেন না।’
গতকাল বিকেলে রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) মিলনায়তনে ‘২৮ অক্টোবর রাজধানীর পল্টনে আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার তাণ্ডবে শহীদ পরিবার’-এর সদস্যদের সঙ্গে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় বিএনপিকে সতর্ক করে জামায়াতের আমির বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে গুম, খুন ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বলে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের কাউকে কাউকে এখন আশকারা দেওয়া হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সাপ নিয়ে নাড়াচাড়া করবেন না, সেই সাপই ছোবল দিয়ে শেষ করে দেবে।’ তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বলে বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে প্রতীয়মান হয়।
আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তাঁর দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল নয়; বরং এটি ফ্যাসিবাদীদের একটি ক্লাব। তাঁর অভিযোগ, দলটি যখনই ক্ষমতায় গেছে, তখনই হত্যা, সন্ত্রাস ও নির্যাতনের মাধ্যমে ক্ষমতা সুসংহত করার চেষ্টা করেছে। তিনি আরও দাবি করেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দেশে সন্ত্রাস, লুটপাট, তাণ্ডব ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছিল। ওই সময় রক্ষীবাহিনীর হাতে ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্ট কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর পল্টনে সংঘটিত সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের আমির অভিযোগ করেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে লগি-বৈঠা নিয়ে লোকজনকে ঢাকায় আসতে বলা হয়েছিল। ওই হত্যাকাণ্ডে বামপন্থী দলগুলোর নেতাকর্মীরাও আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, তাঁদের সহকর্মীদের হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করা হয়েছিল। এ ঘটনায় বাপ্পাদিত্য বসুর নাম উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, নিহতদের মরদেহ সরিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে প্রতিরোধের মুখে তা ব্যর্থ হয়। ২৮ অক্টোবরের ঘটনাকে বিভীষিকাময় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সেদিনের সহিংসতা মোকাবিলায় তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, মাগরিবের আগ পর্যন্ত রাজধানীতে তাণ্ডব চললেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হলেও পরবর্তী সময়ে এক-এগারোর সরকারের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মামলার নথিপত্র ও আলামত নষ্ট করে এবং মামলা প্রত্যাহার করে নেয়।
জামায়াতের নেতাদের বিরুদ্ধে অতীতে দায়ের করা মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে মামলা দিয়ে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরিণতি সংশ্লিষ্টদের ভোগ করতে হবে। এসব ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, তাঁরা বিচারের শেষ দেখে ছাড়বেন, ইনশাআল্লাহ।
দেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তির হাতে বাংলাদেশকে ইজারা দেওয়া হবে না। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার রক্ষায় তাঁরা সতর্ক থাকবেন এবং কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবেন না।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি আবারও বলেন, দলটির মধ্যে যাঁরা ভালো মানুষ এবং দেশকে ভালোবাসেন, তাঁরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী রাজনৈতিক অবস্থান ও ঠিকানা বেছে নিতে পারেন। তবে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে-এমন চিন্তা বা স্বপ্ন না দেখার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে এ ধরনের আশঙ্কা দেখিয়ে জনগণকে ভীত করার চেষ্টা না করতেও বলেন।
সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে জনগণ গণভোটে রায় দিয়েছে, সংবিধানকে ইচ্ছামতো পরিবর্তন করার জন্য নয়। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার বিষয়টি ভুলে গেছে। এ অবস্থান থেকে ফিরে এসে সংবিধান সংস্কারের জন্য গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিমের সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, মাওলানা আবদুল হালিম ও এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এ ছাড়া বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
সভায় শহীদ হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের বাবা মো. তাজুল ইসলাম, শহীদ মুজাহিদুল ইসলামের মামা মিজান আহম্মেদ, শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের মা শামছুন্নাহার রুমি এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি আবু সাদিক কায়েমসহ জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।