সারাদেশ
মাসুদ সাঈদীর ইস্তানবুল হোটেলের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিল প্রশাসন
যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না থাকার অভিযোগে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নির্মাণস্থলে নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত একটি ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির অনুমোদন, জমির মালিকানা ও নির্মাণসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর প্রশাসনের এ পদক্ষেপ সামনে এসেছে।
নির্মাণস্থলে টাঙানো ব্যানারে উল্লেখ করা হয়েছে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ করায় নির্দেশক্রমে এর কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও ব্যানারে সতর্ক করা হয়েছে।
নির্মাণকাজ বন্ধের সময় উপস্থিত ছিলেন কুয়াকাটা সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান এবং কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী মৌজার এসএ ২৯২ নম্বর খতিয়ানে প্রায় ২১ একর ৬৬ শতক জমিজুড়ে ইস্তানবুল প্রকল্পের কার্যক্রম চলছিল। প্রকল্প এলাকায় একটি মসজিদ ও কনভেনশন হল নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে। চলতি বছরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কুয়াকাটা পৌরসভার মুসল্লিয়াবাদ গ্রামসংলগ্ন এলাকায় হোটেল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এরই মধ্যে প্রকল্প এলাকায় অন্তত ছয় একর জমির উন্নয়ন এবং সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে।
কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণ আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ছাড়া কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যানে সংশ্লিষ্ট জমি রেলওয়ের স্থাপনার জন্য বরাদ্দ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এসব কারণেই স্থাপনাটির নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিএস জরিপে জমিটি কুয়াকাটা পৌরসভার আওতাধীন।
তবে প্রকল্পের স্থানীয় প্রতিনিধি মো. মনির মুসুল্লী এ বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ইস্তানবুল একটি বড় প্রকল্প। এর জন্য ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবন নির্মাণের অনুমতি চেয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। কুয়াকাটা পৌরসভা থেকেও অনাপত্তিপত্র নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এরপরও আপত্তি তোলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে তাঁদের মনে হচ্ছে-এমন অভিযোগও করেন মনির মুসুল্লী। তবে তাঁর বক্তব্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এদিকে, হোটেল নির্মাণের জন্য বায়না করা জমির মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতাও রয়েছে। জমিটির উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা দাবি করে পটুয়াখালীর যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা করেছেন স্থানীয় চার বাসিন্দা—কাজলী বেগম, নাজমুন নাহার, মো. আসলাম ও মো. লিটন মিয়া। মামলা চলমান থাকায় জমিটি বিক্রির ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনারের অনুমোদন নেওয়ার শর্ত দিয়েছে সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি অফিস বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জমিটির মালিকানা নিয়ে দাবি তুলেছে আরও একটি পক্ষ। কুয়াকাটার বালিয়াতলীর হাড়িপাড়া রাখাইন পল্লির বাসিন্দাদের দাবি, ওয়ারিশ সূত্রে ওই জমির মালিকানা রাখাইন সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষদের। চলতি বছরের ২১ এপ্রিল কুয়াকাটা কলাপাড়া প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি জানান রাখাইন পল্লির বাসিন্দা বোচান। তাঁর অভিযোগ, সিএস, আরএস ও এসএ জরিপের রেকর্ডে তাঁদের পূর্বপুরুষদের নামে জমিটির তথ্য রয়েছে। তা সত্ত্বেও প্রভাবশালীরা সেখানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব মালিকানা দাবি ও অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো তথ্য নেই।
কোম্পানি নিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড’-এর চেয়ারম্যান পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী। পিরোজপুর সদর, নাজিরপুর ও ইন্দুরকানী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি ইন্দুরকানী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।
কোম্পানিটির মোট শেয়ারসংখ্যা ২০ হাজার। এর মালিকানায় রয়েছেন চারজন-চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এমদাদুল হক এবং পরিচালক মো. আবু তৈয়ব ও হাফিজুর রহমান। নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রত্যেকের নামে পাঁচ হাজার করে শেয়ার রয়েছে। অর্থাৎ, প্রত্যেকের মালিকানার পরিমাণ ২৫ শতাংশ।
এর আগে ইস্তানবুল হোটেল প্রকল্প নিয়ে ‘মাসুদ সাঈদীর ইস্তানবুল হোটেলে বিনিয়োগকারীদের ১৭৫ কোটি টাকা গেল কোথায়’ এবং ‘৬ বিঘার অনুমোদন নিয়ে ৩০ বিঘার শেয়ার বিক্রি করছে মাসুদ সাঈদীর ইস্তানবুল হোটেল’ শিরোনামে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে এশিয়া পোস্ট। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয় এবং এর অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে প্রশাসন কাজ শুরু করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধের ঘটনায় অনুমোদন, জমির ব্যবহার, মালিকানা এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে জমির মালিকানা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের দাবি এবং প্রকল্পের অনুমোদনসংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।