জাতীয়

শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে জার্মানি


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম

শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে জার্মানি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যকার দীর্ঘদিনের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে একযোগে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। শ্রম আইন বাস্তবায়ন, সামাজিক সংলাপ, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ এবং শ্রমিকদের কল্যাণে বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

মঙ্গলবার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন জার্মান ফেডারেল অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের ভাইস মিনিস্টার ড. বার্বেল কফলার। এ সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লটজসহ দেশটির একটি প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিল। এ ছাড়া পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রহমান তরফদার বৈঠকে অংশ নেন।

সাক্ষাৎকালে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ সরকারের অন্যান্য মন্ত্রীর সঙ্গে জার্মান প্রতিনিধিদলের এ ধরনের বৈঠক দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে। জার্মানির সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সহযোগিতামূলক সম্পর্কের প্রশংসা করে তিনি বলেন, দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার শ্রমিকদের শোভন কাজ, কল্যাণ এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, কার্যকর সামাজিক সংলাপ, শ্রম অধিকার সংরক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এসব বিষয় সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের শ্রম খাতের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ও সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে আরিফুল হক চৌধুরী জানান, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই বাংলাদেশ শ্রম আইনের সংশোধনী পাস করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন নম্বর ১৫৫, ১৮৭ ও ১৯০ অনুসরণে বাংলাদেশ উদ্যোগ নিয়েছে। শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে সামাজিক সংলাপ জোরদার, শ্রমবিরোধ নিষ্পত্তি এবং শ্রম প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়াতেও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সংশোধিত শ্রম আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বর্তমানে বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা সংশোধনের প্রক্রিয়া চলছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ সুরক্ষার পাশাপাশি দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক কার্যক্রম, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং টেকসই বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের আর্থিক সুরক্ষার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ২০২২ সালের জুন থেকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে পরীক্ষামূলকভাবে এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম (ইআইএস) চালু রয়েছে। আইএলও কনভেনশন নম্বর ১২১-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত এ স্কিমের আওতায় কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার কারণে স্থায়ী অক্ষমতা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক কিংবা তাঁদের পরিবারকে মাসিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।

মন্ত্রী জানান, বর্তমানে পরীক্ষামূলক এ স্কিমটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এবং চামড়া ও জুতা খাতেও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। স্কিমটিকে জাতীয় পর্যায়ে চালু করার লক্ষ্যে উপযুক্ত অর্থায়ন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নির্ধারণের কাজ চলছে। এ উদ্যোগে জার্মান সরকারের সহযোগিতার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

বৈঠকে জার্মান ফেডারেল অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের ভাইস মিনিস্টার ড. বার্বেল কফলার বাংলাদেশের শ্রম আইন সংশোধন এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, শ্রম আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে সংশোধিত আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

ড. বার্বেল কফলার আরও বলেন, শোভন কাজ ও শ্রমিকদের মর্যাদা নিশ্চিত না করে কোনো ব্যবসায়িক মডেল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগে জার্মানির ভোক্তাদের মধ্যে কম দামে পোশাক কেনার প্রবণতা বেশি গুরুত্ব পেত। তবে বর্তমানে পোশাক তৈরির সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশের বিষয়েও ভোক্তারা অনেক বেশি সচেতন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে টেকসই ব্যবসা পরিচালনার জন্য শ্রমিকদের কল্যাণ ও অধিকার নিশ্চিত করা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান, আ স ম আশরাফুল ইসলাম ও হুমায়ুন কবীর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ফরহাদ সিদ্দিক এবং শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবদুছ সামাদ আল আজাদসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে বাংলাদেশের শ্রম খাতের সংস্কার, শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-জার্মানি সহযোগিতার গুরুত্ব উঠে আসে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন শ্রমিকদের কল্যাণের পাশাপাশি বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের টেকসই উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে।