সারাবিশ্ব
ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে পুতিনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় ফিনল্যান্ড-নরওয়ের নেতারা
ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসেছেন ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব এবং নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত এই ফোনালাপে দুই নেতা ইউক্রেনে হামলা বন্ধ, সংঘাত প্রশমন এবং শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে তাঁদের এই উদ্যোগকে মস্কোর সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নরওয়ের রাজধানী অসলোতে গত ২০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বৈঠকের ধারাবাহিকতায় পুতিনের সঙ্গে এই ফোনালাপ হয়। ওই বৈঠকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিনিধিরা ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেন। ফিনল্যান্ড ও নরওয়ে জানিয়েছে, পুতিনের সঙ্গে কথোপকথনের উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে সরাসরি বার্তা পৌঁছে দেওয়া। তবে দুই নেতা স্পষ্ট করেছেন, তাঁরা পুরো ইউরোপের প্রতিনিধিত্ব করে এই আলোচনা করেননি।
ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাবের মতে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধের ফলাফল শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে পুরো ইউরোপের নিরাপত্তার ওপর। রাশিয়ার সঙ্গে সীমান্ত থাকা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ফিনল্যান্ড এই সংঘাতের পরিণতি নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে, নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরে সতর্ক করেছেন, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বিপুল প্রাণহানি, ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক ক্ষতির প্রভাব বহু প্রজন্ম ধরে বহন করতে হবে। তাই সংঘাত কমিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা জরুরি বলে মনে করেন তাঁরা।
অন্যদিকে, ক্রেমলিনের বক্তব্য অনুযায়ী, পুতিন আলোচনায় রাশিয়ার নিরাপত্তা ও স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার ওপর জোর দিয়েছেন। মস্কোর অবস্থান হলো, রাশিয়ার স্বার্থ পুরোপুরি বিবেচনায় না নিলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তবে এই বক্তব্য থেকে আলোচনায় কোনো সমঝোতা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যুদ্ধ বন্ধের শর্ত, ইউক্রেনের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা-এসব বিষয় শান্তি প্রক্রিয়ার অন্যতম জটিল প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে।
পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের পর ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের দুই নেতা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গেও কথা বলেন। জেলেনস্কি আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পাশাপাশি রাশিয়ার পক্ষ থেকে বাস্তবসম্মত উত্তেজনা প্রশমনের পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে ইউক্রেনের জ্বালানি খাত ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কেবল আলোচনার উদ্যোগ নিলেই হবে না; যুদ্ধের ময়দানেও উত্তেজনা কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এদিকে, আগামী নভেম্বর মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন দফার ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আলোচনার নির্দিষ্ট তারিখ এখনো নিশ্চিত নয়। অসলোতে অনুষ্ঠিত বৈঠক এবং পুতিনের সঙ্গে সাম্প্রতিক ফোনালাপকে সম্ভাব্য এই আলোচনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউরোপীয় দেশগুলোও শান্তি প্রক্রিয়ায় নিজেদের ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে। তবে আলোচনায় ইউরোপের সরাসরি অংশগ্রহণ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে পুতিনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের এই উদ্যোগ ইউরোপের নেতাদের মধ্যে পুরোপুরি সমর্থন পায়নি। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের উদ্যোগের সমালোচনা করে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে ইউরোপের দেশগুলোর সমন্বিত অবস্থান থাকা প্রয়োজন। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরুর এই প্রচেষ্টা একদিকে নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করলেও অন্যদিকে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও ঐক্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।