সারাবিশ্ব
সামাজিক মাধ্যমে ২১ লাখ অনুসারী, নির্বাচনে মাত্র ৩৩ ভোট
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা ২১ লাখের বেশি। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও ইউটিউবে রয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা। অথচ সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভোট পেয়েছেন মাত্র ৩৩টি। এর মধ্যে ১১টি ভোট এসেছে নিজের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তাকে ভোটের মাঠে সমর্থনে রূপ দিতে না পারার এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন ভারতের রাজস্থানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবক ওমপ্রকাশ বিষ্ণোই।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজস্থানের যোধপুর জেলার ওসিয়ান তহসিলের ইন্দন কি ধানি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতে সরপঞ্চ পদে নির্বাচনে অংশ নেন ওমপ্রকাশ। জ্যোতিষী হিসেবে পরিচিত এই প্রার্থী ইউটিউবেও বেশ জনপ্রিয়। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও ইউটিউব মিলিয়ে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ। অনলাইনে এত বিপুলসংখ্যক অনুসারী থাকায় নির্বাচনে ভালো ফলের প্রত্যাশা করেছিলেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওমপ্রকাশের অনুসারীর সংখ্যা প্ল্যাটফর্মভেদে বেশ উল্লেখযোগ্য। ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারী প্রায় ১৪ লাখ, ফেসবুকে ২ লাখ ৩২ হাজার এবং ইউটিউবে প্রায় ৫ লাখ। অনলাইনে তাঁর পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা থাকলেও নির্বাচনের ফলাফলে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। প্রায় ১ হাজার ৬০০ ভোটারের ওই গ্রাম পঞ্চায়েতে সরপঞ্চ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩৩টি ভোট পান তিনি।
নির্বাচনে মোট তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁদের মধ্যে একজন শিক্ষক পেয়েছেন ৫২৭ ভোট। অন্যদিকে, নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী গাড়ির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় ওমপ্রকাশের ভোটের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় ফলাফল ঘোষণার পর হতাশ হন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল অনুসারী থাকার পরও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে কেন প্রত্যাশিত সমর্থন পাওয়া গেল না, সেই বাস্তবতা নতুন করে উপলব্ধি করেন এই প্রার্থী।
এনডিটিভিকে দেওয়া বক্তব্যে ওমপ্রকাশ জানান, গ্রামের বাসিন্দারাই তাঁকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে উৎসাহিত করেছিলেন। তাঁদের আশ্বাসে তিনি বড় ব্যবধানে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। তবে ভোট গণনার পর সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের বড় ব্যবধান দেখতে পান তিনি।
ওমপ্রকাশ বলেন, ‘গ্রামবাসী বলেছিলেন, আপনি নির্বাচনে দাঁড়ান, আমরা আপনাকে বিপুল ভোটে জিতিয়ে দেব। কিন্তু ভোটের বাক্স খোলার পর দেখলাম, আমি মাত্র ৩৩ ভোট পেয়েছি। ১০টি ভোট পড়েছে “নোটা”য়।’ ভারতের নির্বাচনে নোটা (NOTA) হলো ‘None of the Above’- অর্থাৎ, তালিকাভুক্ত কোনো প্রার্থীকে ভোট দিতে না চাওয়ার বিকল্প।
নির্বাচনী প্রচারের ধরন নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন ওমপ্রকাশ। তাঁর দাবি, ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তিনি টাকা কিংবা নেশাজাতীয় দ্রব্য বিতরণ করেননি। প্রচারের জন্য বড় গাড়িবহর ব্যবহার না করে নিজের আগের গাড়িতেই গ্রামের মানুষের কাছে গিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনে প্রচলিত কিছু কৌশলের পরিবর্তে তিনি নিজের মতো করে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন।
তবে নির্বাচনের ফলাফল তাঁকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা ও বাস্তব জীবনের জনসমর্থনের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করেছে। ওমপ্রকাশের ভাষায়, ‘সামাজিক মাধ্যম এক জিনিস, আর বাস্তব পরিস্থিতি অন্য রকম।’ তিনি জানান, নিজের পাওয়া ৩৩টি ভোটের মধ্যে ১১টি এসেছে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে। বাকি ভোট দিয়েছেন তাঁর সঙ্গে পড়াশোনা করেছেন এমন ব্যক্তি ও ঘনিষ্ঠজনেরা।
নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পেছনে গ্রামের উন্নয়ন নিয়ে কিছু পরিকল্পনাও ছিল ওমপ্রকাশের। তাঁর প্রধান অগ্রাধিকারের মধ্যে ছিল গ্রামের প্রতিটি শিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা করা, অসহায় প্রাণীদের যত্ন নেওয়া এবং বাসিন্দাদের কাছে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন ঘটাতে চেয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
পশুদের সেবায় নিজের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেছেন এই প্রভাবক। তাঁর দাবি, নিজের পরিচালিত গোশালায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ গরু রয়েছে। এ কাজে তিনি নিজের প্রায় ৩০ বিঘা জমি দান করেছেন বলেও জানান। নির্বাচনে পরাজিত হলেও গ্রামের মানুষের কল্যাণে কাজ করার আগ্রহ হারাননি তিনি।
প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রত্যাশিত ফল না পেলেও অভিজ্ঞতাটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন ওমপ্রকাশ বিষ্ণোই। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল অনুসারী থাকা আর নির্বাচনে ভোটারদের আস্থা অর্জন করা এক বিষয় নয়। অনলাইনে জনপ্রিয়তা থাকলেও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক, তাঁদের প্রত্যাশা এবং বাস্তব জনসমর্থন নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই নির্বাচনে পরাজয়কে শেষ কথা হিসেবে না দেখে গ্রামের মানুষের জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন তিনি।