জাতীয়
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত: প্রধানমন্ত্রী
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং দ্রুত নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে মিয়ানমারের চলমান পরিস্থিতির উন্নয়ন, সহিংসতা বন্ধ এবং সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কান্তেই’-তে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে এসব কথা বলেন তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মিয়ানমারের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি এবং এর ফলে সৃষ্ট রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত। এ সংকট নিরসনে সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে নির্বিঘ্নে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে কার্যকর সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদানে জাপানের ভূমিকার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া এবং তাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় জাপানের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা এবং এর টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে পারস্পরিক অংশীদারত্ব জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন দুই দেশের নেতারা। এ ছাড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও শিল্পায়নের লক্ষ্য অর্জনে জাপান সরকার এবং দেশটির বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় অর্থনীতি, বিনিয়োগের সুযোগ এবং উৎপাদনশিল্পের বিকাশে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির গতি আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।
বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং শিল্প খাতের সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আলোচনায় উঠে আসে।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাপানের বিশেষ স্থান রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাপান প্রথমদিকের স্বীকৃতিদানকারী দেশগুলোর একটি। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। দুই দেশের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা, শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুইবার জাপান সফর এবং তাঁর মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক জোরদারে অবদানের কথা স্মরণ করেন। তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা এবং নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
উল্লেখ্য, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বর্তমানে জাপানে রয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরে দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। সফরটি বাংলাদেশ-জাপান সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনে ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।