খেলা
তীব্র তোপের মুখে এমবাপে, বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কা
ফরাসি ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপেকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুংকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড। এ বিতর্কের জেরে চীনের একাধিক প্রতিষ্ঠান তাঁর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফলে মাঠের পারফরম্যান্সে উজ্জ্বল সময় কাটালেও এবার বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় পড়তে পারেন এমবাপে।
বিতর্কের সূত্রপাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফরাসি টকশো ‘দ্য ব্রিজ’-এর একটি ভিডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে। সেখানে নিজের পছন্দের একটি মিম সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে এমবাপে বলেন, একটি ভিডিও দেখে তিনি সবচেয়ে বেশি হাসেন, যেখানে একজন ব্যক্তিকে দেখা যায়। তাঁর ধারণা, ওই ব্যক্তি চীনের একজন স্বৈরশাসক। এমবাপের বক্তব্যের সময় পর্দায় এমন একটি মিম দেখানো হয়, যেখানে চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুংয়ের মতো দেখতে এক ব্যক্তির ছবির ওপর এমবাপের মুখ বসানো ছিল।
ভিডিওতে এমবাপেকে আরও বলতে শোনা যায়, তিনি বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত ওই মিমটি ব্যবহার করেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ক্লিপগুলোর সত্যতা ও পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এমবাপে তাঁর বক্তব্যে সরাসরি মাও সে তুংয়ের নাম উল্লেখ করেছিলেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এদিকে মূল ভিডিওটি বর্তমানে ‘দ্য ব্রিজ’-এর ইউটিউব চ্যানেলে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ভিডিওটির রেকর্ড করা অংশ চীনের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে তাঁরা অবগত। চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে-এমন বক্তব্য বা আচরণের বিরুদ্ধে দেশটির সমাজের বিভিন্ন মহল থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবাদ জানানো হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর এ বক্তব্যের পর এমবাপেকে ঘিরে বিতর্কটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও আলোচনায় আসে।
এদিকে বিতর্কের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এমবাপের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও। চীনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাঁর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির বৃহত্তম দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি মেংনিউ জানিয়েছে, চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে-এমন বক্তব্য বা আচরণের তারা দৃঢ় বিরোধিতা করে এবং এ বিষয়ে তাদের শূন্য-সহনশীলতার নীতি রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির বিবৃতিতে বিতর্কিত ভিডিওটির কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছে চীনের বড় পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দংপেং। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত করে-এমন যেকোনো আচরণের তারা বিরোধিতা করে এবং এ বিষয়ে তাদের শূন্য-সহনশীলতার নীতি রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিবৃতিতে এমবাপের কোন নির্দিষ্ট বক্তব্য বা আচরণকে চুক্তি বাতিলের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কের পাশাপাশি নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, এমবাপে ঠিক কী বলেছিলেন এবং তাঁর বক্তব্যের কোন অংশকে আপত্তিকর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ভিডিওটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট সামনে না আসায় কিছু ব্যবহারকারী বিষয়টি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে চীনা জনগণের জাতীয় অনুভূতি ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে সংবেদনশীলতার বিষয়টি সামনে এনে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। এখন পর্যন্ত এমবাপে কিংবা ‘দ্য ব্রিজ’ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চীনের বাজারে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া তারকাদের বাণিজ্যিক উপস্থিতি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে স্পনসরশিপ ও প্রচারণামূলক চুক্তি থেকে খেলোয়াড়েরা উল্লেখযোগ্য আয় করে থাকেন। ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এমবাপের চুক্তি বাতিলের খবর সত্য হলে তাঁর বাণিজ্যিক আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ কিংবা বাতিল হওয়া চুক্তিগুলোর মোট মূল্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
উল্লেখ্য, মাও সে তুং ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা এবং দেশটির কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রধান নেতা। ১৯৪৯ সালে তাঁর নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকসহ দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর নীতির প্রভাব চীনের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজে গভীরভাবে পড়েছিল। তাঁর শাসনামলের ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচির ফলে ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’-এর সময় ব্যাপক রাজনৈতিক নিপীড়ন, সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৬ সালে মাও সে তুংয়ের মৃত্যুর পর চীনের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
সব মিলিয়ে, মাও সে তুংকে ঘিরে বিতর্কিত মিম ও এমবাপের মন্তব্যের অভিযোগ এখন তাঁর মাঠের বাইরের ক্যারিয়ারেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডগুলোর সিদ্ধান্তের কারণ এবং এমবাপের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সামনে না আসা পর্যন্ত বিতর্কটির সব দিক নিশ্চিতভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন।