সারাবিশ্ব

জনমত জরিপকে ‘ভুয়া’ আখ্যা ট্রাম্পের, নিজের সমর্থন ৬০ শতাংশ দাবি


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৫ পিএম

জনমত জরিপকে ‘ভুয়া’ আখ্যা ট্রাম্পের, নিজের সমর্থন ৬০ শতাংশ দাবি
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিয়ে সাম্প্রতিক একাধিক জনমত জরিপে নেতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রকাশিত এসব জরিপে দেখা গেছে, তাঁর দায়িত্ব পালনে অসন্তুষ্ট মার্কিন নাগরিকের সংখ্যা সন্তুষ্ট নাগরিকের তুলনায় অনেক বেশি। তবে জরিপের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে তাঁর প্রকৃত সমর্থন প্রায় ৬০ শতাংশ। একই সঙ্গে তাঁকে নির্বাচনে পরাজিত করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন এক্সামিনারের সাংবাদিক বাইরন ইয়র্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ট্রাম্প। সাক্ষাৎকারে ইয়র্ক তাঁকে রিয়েলক্লিয়ারপলিটিকসে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপের গড় ফলাফল সম্পর্কে জানান। ওই হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনে সন্তুষ্ট ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। বিপরীতে অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ নাগরিক।

জরিপের এই ফলাফল সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প সরাসরি একে ‘ভুয়া’ বলে আখ্যা দেন। নিজের প্রকৃত জনসমর্থন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জরিপে তাঁর সমর্থন ৩৭ বা ৩৮ শতাংশ দেখানো হলেও তিনি নিজেকে ওই অবস্থানে মনে করেন না। ট্রাম্পের দাবি, তাঁর প্রতি জনসমর্থন জরিপে উঠে আসা সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।

সাক্ষাৎকারে নিজের জনপ্রিয়তা নিয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন, তাঁর ধারণা, তাঁকে কেউ পরাজিত করতে পারবে না। প্রয়োজন হলে, যদিও এখন সেই প্রয়োজন নেই বলে তিনি মনে করেন, তাঁর সমর্থনের হার ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে পারত বলেও দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে ট্রাম্পের দাবির সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ চিত্র পাওয়া গেছে। গত ১৬ থেকে ১৯ অক্টোবর পরিচালিত রয়টার্স-ইপসোসের এক জরিপে দেখা যায়, ট্রাম্পের দায়িত্ব পালনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন মাত্র ৩৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। অন্যদিকে, ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা তাঁর কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ জানিয়েছেন। এই ফলাফল তাঁর প্রশাসনের প্রতি জনসাধারণের মনোভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

এ ছাড়া পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত জরিপেও ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের হার কম দেখা গেছে। ওই জরিপে মাত্র ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা তাঁর দায়িত্ব পালনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। বিপরীতে, ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা অসন্তোষের কথা জানান। অর্থাৎ, জরিপটিতে ট্রাম্পের প্রতি অসন্তুষ্টির হার সন্তুষ্টির হারের দ্বিগুণেরও বেশি ছিল।

এ সপ্তাহে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজের যৌথ জরিপেও ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের হার ছিল ৩৪ শতাংশ। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের জনসমর্থন এত নিচে নেমে যাওয়ার সর্বশেষ নজির দেখা গিয়েছিল ১৯৪৬ সালে। সে সময় প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের প্রতি সমর্থনের হার ছিল ৩৩ শতাংশ। ফলে সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার চিত্র মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

এদিকে জনমত জরিপের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েজউড রিসার্চের বিরুদ্ধে মনগড়া ফলাফল তৈরির অভিযোগ সামনে আসার পর বিভিন্ন জরিপের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ট্রাম্পের জনসমর্থনের গড় হিসাব নির্ধারণে বিতর্কিত ওই প্রতিষ্ঠানের জরিপের তথ্য ব্যবহার করা হয়নি। ফলে জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত ফলাফল আলাদাভাবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।

নিজের জনপ্রিয়তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে ট্রাম্প সিএনএনের প্রধান তথ্য বিশ্লেষক হ্যারি এনটেনের একটি বিশ্লেষণের কথাও উল্লেখ করেন। ওই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা সমর্থক রিপাবলিকানদের ৯৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন ট্রাম্প। গত সেপ্টেম্বরেও এই গোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর প্রতি সমর্থনের হার ছিল ৯৮ শতাংশ বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।

এই তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর সমর্থন বর্তমানে ৬০ শতাংশের ঘরে থাকতে পারে। রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে তাঁর জনপ্রিয়তা অনেক বেশি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে মাগা সমর্থকদের মধ্যে উচ্চ সমর্থনের হার এবং সামগ্রিক মার্কিন জনসংখ্যার মধ্যে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা এক বিষয় নয়। ফলে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমর্থনের পরিসংখ্যান দিয়ে দেশের সব নাগরিকের মনোভাব নির্ধারণ করা যায় না।

অন্যদিকে, হ্যারি এনটেনের বিশ্লেষণে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে জনসাধারণের অসন্তোষ বাড়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এ বিষয়ে সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির ব্যবধান ট্রাম্পের পক্ষে ৮ শতাংশ পয়েন্ট থাকলেও বর্তমানে তা কমে ঋণাত্মক ৪৫ শতাংশ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্টির হার সন্তুষ্টির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এ ছাড়া রয়টার্স-ইপসোসের সাম্প্রতিক আরেকটি জরিপে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের হার ৩১ শতাংশে নেমে আসার তথ্য উঠে এসেছে। জরিপের এই ফলাফলকে তাঁর দুই মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন সমর্থনের হার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে হ্যারি এনটেন একে ‘পাঁচ মাত্রার ভয়াবহ বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে এটি তাঁর নিজস্ব মূল্যায়ন; জরিপের সংখ্যাগত ফলাফল এবং বিশ্লেষকের মন্তব্যকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এতসব জরিপের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুললেও নিজের জনপ্রিয়তা তুলে ধরায় সিএনএনের প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, তাঁকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমটি বেশ কয়েকটি ভালো জরিপ করেছে। সিএনএন যদি এ ধরনের জরিপ অব্যাহত রাখে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি আরও বেশি পছন্দ করবেন বলেও মন্তব্য করেন।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের জনসমর্থন নিয়ে বিভিন্ন জরিপে যে চিত্র উঠে এসেছে, তার সঙ্গে প্রেসিডেন্টের নিজের মূল্যায়নের স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে সামগ্রিক জনসমর্থন ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষের তথ্য উঠে আসছে, অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টি ও মাগা সমর্থকদের মধ্যে নিজের জনপ্রিয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন ট্রাম্প। ফলে তাঁর প্রকৃত জনসমর্থন মূল্যায়নে জরিপের পদ্ধতি, নমুনা এবং কোন জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়া হয়েছে-এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।