সারাবিশ্ব
এল-সাইদ জিতলে ক্রিসমাসও উদযাপন করতে পারবেন না, দাবি ট্রাম্পের
মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী আবদুল এল-সাইদকে লক্ষ্য করে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য ও আক্রমণ আরও জোরালো করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনে এই প্রগতিশীল চিকিৎসক জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, যেখানে মানুষ বড়দিন বা ক্রিসমাসও উদযাপন করতে পারবেন না-এমন মন্তব্য করেছেন তিনি। ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) মিশিগানের পোর্ট হুরন শহরে যান ট্রাম্প। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালাতেই সেখানে যান তিনি। প্রায় দুই ঘণ্টার বক্তব্যে কয়েকশ সমর্থকের সামনে কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তার বক্তব্যের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল মিশিগানের সিনেট নির্বাচন এবং ডেমোক্রেটিক প্রার্থী আবদুল এল-সাইদকে ঘিরে নানা অভিযোগ। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময় ট্রাম্প এল-সাইদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলার পাশাপাশি তাকে ‘জিহাদি’ বলেও আখ্যা দেন।
বক্তব্যে এল-সাইদকে আক্রমণ করে ট্রাম্প বলেন, সিনেটে প্রবেশের আগে মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে যেতে হবে-এমন একমাত্র সিনেটর হবেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চাই তার জন্য মেটাল ডিটেক্টর থাকুক।’ তার এই মন্তব্যের মাধ্যমে এল-সাইদের প্রতি নিরাপত্তাসংক্রান্ত সন্দেহ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
মিশিগানের সিনেট নির্বাচন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট-উভয় দলের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যটির বর্তমান ডেমোক্রেটিক সিনেটর গ্যারি পিটার্স অবসরে যাওয়ায় আসনটি শূন্য হচ্ছে। এই আসনে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী আবদুল এল-সাইদের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে মোট আসন ১০০টি, যার মধ্যে রিপাবলিকানদের দখলে রয়েছে ৫৩টি। এবারের নির্বাচনে ৩৫টি আসনে ভোট হওয়ার কথা। মিশিগানের আসনটি রিপাবলিকানরা দখল করতে পারলে সিনেটে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে দলটি। অন্যদিকে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে ডেমোক্র্যাটদের একাধিক আসনে জয় নিশ্চিত করতে হবে।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প বারবার এল-সাইদের মুসলিম পরিচয়কে সামনে এনে তাকে আক্রমণ করছেন। এর আগে তিনি এল-সাইদের নাম ভুলভাবে ‘মোহাম্মদ’ বলেও উল্লেখ করেন। রোববারের সমাবেশে তার বক্তব্যে এই আক্রমণ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ট্রাম্প দাবি করেন, এল-সাইদ যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াহ আইন চালু করতে চান। তিনি বলেন, ‘আবদুল চায় আমাদের দেশ শরিয়াহ আইনের দিকে এগিয়ে যাক। সে যদি কখনো তা করতে পারে, তাহলে তার বিচার সবার আগে হওয়া উচিত। আমি সাক্ষী হব।’
সমাবেশে এল-সাইদের নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত কয়েকজন ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে চিৎকার করেন। এ সময় ট্রাম্পও তার বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি, যাতে একজন জিহাদি, মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হতে না পারেন।’ তবে এল-সাইদের মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য হওয়ার দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
আবদুল এল-সাইদ যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী একজন মার্কিন নাগরিক এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা। তিনি দেশটির সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুড কিংবা অন্য কোনো বিদেশি সংগঠনের সদস্য হওয়ার প্রমাণ নেই। ফলে তার ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের বক্তব্য এবং নিরাপত্তা নিয়ে তোলা অভিযোগ রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিমবিদ্বেষকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নতুন নয়। ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের শুরুতে তিনি মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। এই পদক্ষেপটি ব্যাপকভাবে ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’ নামে পরিচিতি পায়। তবে ওই নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আইনি ও নীতিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়।
রোববারের সমাবেশেও ট্রাম্প মুসলিম অভিবাসনকে কেন্দ্র করে ভীতি ছড়ানো বক্তব্য দেন। তিনি দাবি করেন, এল-সাইদ ও ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে জয়ী হলে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিপুলসংখ্যক জিহাদির প্রবেশ ঘটবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আবদুল ও ডেমোক্র্যাটরা জিতলে তারা বন্যার বাঁধ খুলে দেবে। আমাদের তীরে ডেকে আনবে জিহাদিদের দল। সহিংসতা আর সন্ত্রাসের এমন দুঃস্বপ্ন তৈরি হবে যে ক্রিসমাসটাও আপনারা উদযাপন করতে পারবেন না।’
অন্যদিকে, এল-সাইদ এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের অধিকাংশ আক্রমণকে জনসাধারণের মনোযোগ মূল সমস্যা থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বক্তব্যে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে ধর্মীয় পরিচয় ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিযোগের পরিবর্তে এসব নীতিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত বলেও তার অবস্থান থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মিশিগানের এই নির্বাচন তাই শুধু একটি সিনেট আসন দখলের লড়াই নয়; বরং অভিবাসন, ধর্মীয় পরিচয়, জাতীয় নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থীকে বেছে নেন, তার ওপর সিনেটে দুই দলের শক্তির ভারসাম্য এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।