অর্থনীতি

বাংলাদেশে পাঁচ বছরে ৬৩৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা জাপানের


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৮ এএম

বাংলাদেশে পাঁচ বছরে ৬৩৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা জাপানের
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে ১ লাখ কোটি জাপানি ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে জাপান। এ পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্প, গাড়ি নির্মাণ, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রস্তাবিত এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নিক্কেই এশিয়ার গত ২২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ১ লাখ কোটি ইয়েনের বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার বিষয়ে সম্মত হতে পারে জাপান। এ বিনিয়োগ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হতে পারে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিল্প খাতের সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি অবকাঠামোর উন্নয়ন। বিশেষ করে গাড়ি উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য উৎপাদনমুখী খাতেও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশে জাপানের সংশ্লিষ্টতায় গড়ে ওঠা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোও এ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। এসব অঞ্চলে জাপানি ও অন্যান্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাড়লে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সুমিতোমো করপোরেশনসহ কয়েকটি পক্ষ বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে যুক্ত রয়েছে। এসব অঞ্চলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে জাপানি প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও শিল্পদক্ষতা বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে কাজে লাগানোর সুযোগ বাড়তে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্প খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন সম্প্রসারণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে চার দিনের সরকারি সফরে সোমবার সকালে টোকিও পৌঁছেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। এ প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনাটি দুই দেশের অর্থনৈতিক আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

সফরসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে বসার কথা রয়েছে তারেক রহমানের। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। বৈঠক শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে যৌথ বিবৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

দুই দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র চিহ্নিত করাও এ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশেষ করে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাপানের সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ও দুই নেতার আলোচনায় স্থান পেতে পারে।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।

এ ছাড়া মিতসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন ও জেরা-সহ জাপানের বড় বড় কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, শিল্প খাতের সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হতে পারে। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহী হলে তা দেশের শিল্প ও অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

বুধবার টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। এ ফোরামে দুই দেশের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা অংশ নেবেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিনিয়োগের সম্ভাবনা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। একই দিনে প্রধানমন্ত্রী জাপানি পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করবেন এবং প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

সফরের শেষ দিন বৃহস্পতিবার নাগোয়া শহরে টয়োটা মোটর করপোরেশনের মোটোমাচি কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। গাড়ি উৎপাদনে জাপানের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের শিল্প খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভবিষ্যতে এ খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারিত হলে গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদন, সংশ্লিষ্ট শিল্পের বিকাশ এবং দক্ষ জনবল তৈরির নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে এ সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই হয়েছে। এ চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানো সফরের অন্যতম লক্ষ্য। চুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্প, গাড়ি নির্মাণ এবং জ্বালানি অবকাঠামো খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে পরিকল্পনাটি কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, কোন কোন প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয় এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে কতটা নতুন উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় তার ওপর। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল নীতিমালা, উন্নত অবকাঠামো এবং ব্যবসা পরিচালনার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সব মিলিয়ে, জাপানের প্রস্তাবিত ৬৩৫ কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। পরিকল্পনাটি বাস্তব রূপ পেলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্প খাতের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিনিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।