রাজনীতি
বিরোধীদলে থাকতেই কবর দিতে বাধা, রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে কী করবেন: তাসনিম জারা
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা অভিযোগ করেছেন, নিজেদের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের কথা বললেও অন্যদের ক্ষেত্রে সেই নীতির প্রতিফলন ঘটাতে নারাজ জামায়াতে ইসলামী। পিরোজপুরে ৮৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বিরোধীদলে থেকেই যদি কাউকে নিজের বসতভিটায় দাফন করতে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা হাতে পেলে কী করা হবে?
সোমবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব মন্তব্য করেন তাসনিম জারা। সেখানে তিনি মৃত্যুর পর একজন মানুষের মর্যাদা রক্ষা, শোকাহত পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা এবং দাফনের মতো ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, মানিক পশারীকে দাফন করা নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
পোস্টে তাসনিম জারা লেখেন, বাংলাদেশের সমাজে সাধারণত কেউ মারা গেলে তার দাফনের জন্য কবর খুঁড়তে আলাদা করে কাউকে ডেকে আনতে হয় না। মৃত্যুর খবর পেয়ে এলাকার তরুণেরা কোদাল হাতে এগিয়ে আসেন। কেউ বাঁশ সংগ্রহ করেন, কেউ চাটাই নিয়ে আসেন। মৃত ব্যক্তির দাফনে দেরি করা উচিত নয়-এমন শিক্ষা নিয়েই মানুষ বড় হয়। কিন্তু পিরোজপুরে মানিক পশারীর মৃত্যুর পর সেই পরিচিত সামাজিক চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে তাসনিম জারা লেখেন, শনিবার সকাল ১০টার দিকে ৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারী মারা যান। এরপর সারাদিন তার পরিবারকে মরদেহ নিয়ে উৎকণ্ঠার মধ্যে অপেক্ষা করতে হয়। তার অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করেন এবং মাইক ও ফেসবুকের মাধ্যমে ঘোষণা দেন যে মানিক পশারীকে পিরোজপুরে দাফন করতে দেওয়া হবে না। ফলে স্বজন হারানোর শোকের মধ্যেও পরিবারটিকে দাফন নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়।
তাসনিম জারা জানান, মানিক পশারীকে দাফনের জন্য প্রথমে বাড়িতে একটি কবর খোঁড়া হয়েছিল। তবে তার মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কয়েকজন ব্যক্তি এসে সেই কবর ভরাট করে দেন। পরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় কবর খোঁড়ার কাজে অন্য কাউকে পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত পরিবারের নারী সদস্যদেরই কবর খুঁড়তে হয়। তাসনিম জারার ভাষ্য অনুযায়ী, যে কোদাল সাধারণত পাড়ার তরুণদের হাতে থাকার কথা, সেদিন সেই কোদাল তুলে নিতে হয়েছিল মৃত ব্যক্তির মেয়ে ও বোনদের।
তিনি আরও লেখেন, শেষ পর্যন্ত শনিবার দিবাগত মধ্যরাতের পর পুলিশি পাহারায় মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। তার মেয়ে ও বোনদের খোঁড়া কবরে তাকে সমাহিত করা হয়। প্রশাসনের সদস্যদের বাইরে পরিবারের বাইরের অন্য কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন না বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন তাসনিম জারা। তার মতে, একজন প্রবীণ ব্যক্তির মৃত্যুর পর স্বাভাবিক সামাজিক সহমর্মিতা ও পারিবারিকভাবে দাফন সম্পন্ন করার সুযোগটুকুও ওই পরিবার পায়নি।
তাসনিম জারা উল্লেখ করেন, মানিক পশারী একজন সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। তার পোস্টের ভাষ্য অনুযায়ী, পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সেদিন মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে তাকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না এবং পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না বলেও বক্তব্য দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। অথচ দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর ওই একই নেতা বলেছেন, জামায়াতের নেতারা লাশের রাজনীতি করেন না বলে তাসনিম জারা তার পোস্টে উল্লেখ করেন।
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মানিক পশারীর পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার কারও থাকতে পারে-এ কথা স্বীকার করে তাসনিম জারা বলেন, এমন কোনো প্রশ্ন থাকলে তা যাচাই করার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আদালত রয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় তার পরিচয় ও স্বীকৃতির বিষয়টি যাচাই করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো অভিযোগের মীমাংসা দাফনে বাধা দিয়ে কিংবা মাইক হাতে ঘোষণা দিয়ে করা যায় না। তার মতে, অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত আইনসম্মত প্রক্রিয়ায়, কোনো ব্যক্তির মরদেহ বা শোকাহত পরিবারকে চাপের মুখে ফেলে নয়।
মৃত ব্যক্তির প্রতি সামাজিক ও ধর্মীয় আচরণের প্রসঙ্গ তুলে তাসনিম জারা লেখেন, বাংলাদেশের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী জানাজার আগে মৃত ব্যক্তির ছেলে, ভাই কিংবা স্বজনেরা মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন। কেউ জীবদ্দশায় কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ জানান। মানুষও সাধারণত মৃত্যুর পর বিদেহী ব্যক্তির প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়ে ক্ষমা করে দেন। কারণ, মৃত্যুর পর মানুষের ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশের চেয়ে তার প্রতি শেষ সম্মান ও শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোই বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু পিরোজপুরে মানিক পশারীর ক্ষেত্রে সেই স্বাভাবিক মানবিক পরিবেশ তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তাসনিম জারা আরও বলেন, নিজের গ্রামে মানিক পশারীর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়নি বলে তিনি তার পোস্টে উল্লেখ করেছেন। ফলে গ্রামের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার প্রচলিত সুযোগটুকুও স্বজনেরা পাননি। তার মতে, কোনো ব্যক্তির পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা অতীত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মৃত্যুর পর তার দাফন ও পরিবারের শোক পালনের অধিকারকে সম্মান করা উচিত।
পোস্টে ‘পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না’ বক্তব্যটিরও সমালোচনা করেন তাসনিম জারা। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এমনভাবে কথা বলা হচ্ছে যেন পিরোজপুরের মাটির মালিকানা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাতে রয়েছে। একজন ব্যক্তি নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শায়িত হতে পারবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের থাকতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে অতীতে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত ‘রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’ স্লোগানের উদাহরণ টানেন তাসনিম জারা। তার বক্তব্য, এ ধরনের স্লোগান যেমন অন্যায় ও অগ্রহণযোগ্য, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে নিজের এলাকায় দাফন করতে না দেওয়ার ঘোষণাও একই ধরনের বৈষম্যমূলক মানসিকতার প্রকাশ। তার অভিযোগ, ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতেই জামায়াতের নেতাকর্মীদের একাংশ অন্যদের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে ভিন্ন অবস্থান নিচ্ছেন।
একাত্তরে জামায়াতে ইসলামী দল হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল উল্লেখ করে তাসনিম জারা বলেন, এখন সেই দলের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন আর কার কবর কোথায় হবে-এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিজেদের হাতে তুলে নিতে চাইছেন। তার মতে, মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকলে তার সমাধান রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান ও যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে হওয়া প্রয়োজন; রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নয়।
পোস্টের শেষাংশে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাস্তব আচরণের মধ্যে অসংগতির অভিযোগ তোলেন তাসনিম জারা। তিনি বলেন, দলটি নিজেদের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও মানবিক মর্যাদার কথা বলে। নির্বাচনের আগে এবং রাজনৈতিক বক্তব্যেও ইনসাফের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেই নীতিগুলোর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মানিক পশারীর দাফন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে সামনে রেখে তাসনিম জারা প্রশ্ন তোলেন, বিরোধীদলে থাকা অবস্থাতেই যদি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা একজন মৃত ব্যক্তিকে তার নিজের বসতভিটায় দাফন করতে বাধা দেন, তাহলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা তাদের হাতে গেলে সাধারণ মানুষের অধিকার ও মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত থাকবে? তার এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার, মানবিক মূল্যবোধ এবং আইনের শাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।