রাজনীতি

সংবিধান মানলে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কোনো নির্বাচন নেই


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম

সংবিধান মানলে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কোনো নির্বাচন নেই
ছবি: সংগৃহীত

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেছেন, সংবিধান মেনে চললে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল না। তাহলে সেই নির্বাচন না হলে বিএনপি সরকার গঠন করল কীভাবে এবং জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দলে গেল কীভাবে? তাঁর দাবি, দেশের রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ বর্তমান সংবিধানের কাঠামো। এই সংবিধান শুধু ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে তা নয়, বরং ফ্যাসিবাদকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার ব্যবস্থাও তৈরি করেছিল। তাই সংবিধান নিয়ে প্রচলিত রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমার প্রশ্ন, আপনারা এখন সংবিধান খুঁজছেন কেন? সংবিধান মেনেই তো সাড়ে ১৫ বছর সরকারের সদয় অনুমতি নিয়ে কিছু সভা-সমাবেশ ও মিছিল করেছেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদকে তাড়াতে পারেননি। আমরাও পারিনি, আপনারাও পারেননি। এটাই বাস্তবতা।’ তাঁর মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোয় কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে।

বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কারাগারে আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় বিএনপির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা কারাগারে ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে একই কারাগারে থাকার সময় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতো। তখন কেউ কেউ মনে করতেন, ২০৪১ সালের আগে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হবে না। তিনি তখন বলেছিলেন, এত দিন অপেক্ষা করতে হবে না; বরং শেখ হাসিনার উত্তরসূরিরাও একই রাজনৈতিক ধারা বহন করতে পারেন। সে সময় তিনি পরিবর্তনের সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছিল না, তবে আল্লাহর ইচ্ছায় পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর অনেক রাজনৈতিক নেতা অতীতের ঘটনাগুলো ভুলে গেছেন। অথচ অতীতে সভা-সমাবেশ ও মিছিল করতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে মাত্র দুটি সভা করার সুযোগ পেয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, এসব সভার জন্য সরকার অনুমতি দেয়নি। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের কর্মসূচির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তখন তাঁরা জানিয়ে দিয়েছিলেন, অনুমতি না পেলেও সভা করবেন।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যেসব বিষয়ে পরিবর্তন প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত দিয়ে রেখেছে। আবার যেসব বিষয়ে ভিন্নমত দেওয়া হয়নি, সেগুলোও এখন এড়িয়ে চলা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর প্রশ্ন, জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের অনুষ্ঠান দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হলো কেন, গণভবনে বা অন্য কোথাও হলো না কেন? তাঁর মতে, এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছিল। অতীতে সংসদে বসেই জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে লক্ষ্যেই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জামায়াত আমির বলেন, তাঁদের আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট দলের দাবি কিংবা ১১-দলীয় জোটের স্বার্থে নয়; বরং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। তাঁদের প্রতিটি দাবি জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণ অতীতের দুর্নীতিগ্রস্ত ও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন চান। তাঁরা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সংস্কার এবং কার্যকর পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। এতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের সদস্যরা অংশ নেন। দীর্ঘ সাত মাসের বেশি সময় ধরে দিন-রাত আলোচনা করে অধিকাংশ বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করা হয়। কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অঙ্গীকার ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, সেই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর অংশীজনেরা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রথমে স্বাক্ষর না করলেও পরবর্তী সময়ে তারাও সনদে স্বাক্ষর করে। তাঁর মতে, এই সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়; বরং গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উঠে আসা জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

একই দিনে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, তাঁরা একই দিনে দুটি ভোট আয়োজনের পক্ষে ছিলেন না। তাঁদের দাবি ছিল, আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, এরপর জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। দুটি ভোট একই দিনে হলে সাধারণ মানুষের কাছে বিষয় দুটি গুলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্য হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, গণভোটের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিকভাবে কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বিএনপি একই দিনে ভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছিল এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই দাবি মেনে নেয়। পরে বিএনপি এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও অন্তত একবার গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন। জামায়াতও একই অবস্থান নিয়েছিল। তবে বিএনপি বাস্তবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ছিল না বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, দেশে-বিদেশে দলটির পক্ষ থেকে নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের ‘না’ ভোট দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের মধ্য দিয়ে জনগণ তাঁদের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট করেছেন। অথচ দেশে এখনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং বৈষম্য আরও বাড়ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তাঁদের অন্যতম দাবি ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে তাঁরা যে প্রত্যাশা তুলে ধরেছিলেন, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, জনগণের সঙ্গে করা অঙ্গীকার রক্ষা করা জরুরি। এখন সংবিধান সংশোধনের কমিটি গঠনের কথা বলা হচ্ছে। তাঁর আহ্বান, এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা করতে হবে এবং নোট অব ডিসেন্টের জায়গাগুলোতে সমঝোতা করতে হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করার পর বিরোধী দলকেও কি একইভাবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করতে বলা হচ্ছে? জামায়াতে ইসলামী তা মেনে নেবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রশ্নে তাঁরা অটল থাকবেন।

সংবিধান সংশোধনের আইনি দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, আইনজীবী, আইনপ্রণেতা ও নাগরিক সমাজের অনেকেই মনে করেন, অতীতেও একাধিকবার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেসব সংশোধনী আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বা বাতিল হয়েছে। তাই শুধু আরেকটি সংশোধনী এনে সমস্যার সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে ভাবতে হবে। অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে কার্যকর ও টেকসই সংস্কারের পথে এগোনোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

নিজেদের আন্দোলনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ভালোবাসা তাঁদের সঙ্গে রয়েছে। তাঁরা জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছেন এবং এ লড়াইয়ে জনগণের বিজয় হবে বলে তিনি আশাবাদী। তাঁর ভাষায়, এই বিজয় কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা পরিবারের হবে না; বরং হবে দেশের সাধারণ মানুষের।

প্রধানমন্ত্রীর জীবনযাপন ও সাধারণ মানুষের দ্রব্যমূল্যের চাপের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা বলেছেন। এ বিষয়ে তাঁকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চাইলে নিজের পছন্দ ও সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার খেতে পারেন; এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে সাধারণ মানুষ যাতে অন্তত দুবেলা খাবার স্বস্তিতে খেতে পারেন এবং শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের লোকজন সাধারণ মানুষের শান্তি কেড়ে নিচ্ছেন।

আসন্ন লংমার্চ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ইনশাআল্লাহ, ঢাকা থেকে শুরু হয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে লংমার্চ শেষ হবে। এ কর্মসূচিকে ঘিরে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র না করার আহ্বান জানান তিনি। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে লংমার্চের কাফেলা চট্টগ্রামে পৌঁছেছিল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেদিন পথে বাধা এলেও তাঁরা কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনড় ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, তাঁরা ন্যায় ও জনগণের অধিকারের পক্ষে রয়েছেন বলে বিশ্বাস করেন। আল্লাহর সাহায্যে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। কোনো বাধা বা ষড়যন্ত্রের কাছে মাথা নত করবেন না উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।