সারাবিশ্ব
ইউক্রেনগামী মালবাহী জাহাজে রাশিয়ার ড্রোন হামলা
ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর জন্য সামরিক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহে ব্যবহৃত একটি মালবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। কৃষ্ণসাগরের বন্দরনগরী চোরনোমোরস্কের দিকে যাত্রা করা জাহাজটিকে লক্ষ্য করে রাতভর এ হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। রবিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানায়। একই সঙ্গে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিকস ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি স্থাপনায় হামলার কথাও দাবি করেছে মস্কো।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভে একটি লজিস্টিকস সেন্টার, একটি ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার এবং একটি লজিস্টিকস টার্মিনালে হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। মন্ত্রণালয়ের দাবি, এসব স্থাপনা ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর জন্য সামরিক ও বেসামরিক-উভয় ধরনের কাজে ব্যবহারযোগ্য পণ্য সংরক্ষণ এবং বিতরণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ফলে জাহাজের পাশাপাশি ইউক্রেনের সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকেও হামলার আওতায় আনার দাবি করেছে রাশিয়া। তবে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহব্যবস্থা, সামরিক রসদ পরিবহন এবং অস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে সংঘাতের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের কাছে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এসব সরঞ্জাম উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহনের ব্যবস্থাও সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। এ কারণে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি রসদ সরবরাহের পথ এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোও দুই পক্ষের সামরিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের শুরু থেকেই ইউক্রেনের সামরিক অবকাঠামো, অস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র ও সরবরাহব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন সময়ে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। অন্যদিকে, ইউক্রেনও রুশ সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং রসদ সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে আসছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতে ড্রোনের ব্যবহার ক্রমেই বেড়েছে। তুলনামূলক কম খরচে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতার কারণে ড্রোন এখন দুই পক্ষের আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণে পরিণত হয়েছে।
ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং পশ্চিমা মিত্রদের সরবরাহ করা সামরিক সহায়তাও যুদ্ধের পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কিংবা প্রতিরোধের ফাঁক কাজে লাগিয়ে রাশিয়া বিভিন্ন অঞ্চলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর চেষ্টা করছে বলে বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো হামলার কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণের জন্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।
এদিকে, ইউক্রেনের অস্ত্র উৎপাদন ও ড্রোন তৈরির সক্ষমতা কমিয়ে আনার চেষ্টা রাশিয়ার সামরিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হয়। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন, সংযোজন, মেরামত ও সংরক্ষণের ব্যবস্থাও যুদ্ধের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে কোনো বেসামরিক শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক স্থাপনা কিংবা মালবাহী জাহাজ সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে-এমন দাবি উঠলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, কোনো স্থাপনাকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়। একই সঙ্গে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এবং সামরিক সুবিধার মধ্যে আনুপাতিকতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
চোরনোমোরস্কগামী মালবাহী জাহাজ ও খারকিভের লজিস্টিকস স্থাপনাগুলোতে হামলার বিষয়ে রাশিয়ার দাবি সত্য হলে, তা ইউক্রেনের সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে। তবে হামলায় জাহাজটির কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর কার্যক্রম কতটা ব্যাহত হয়েছে-এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া না গেলে পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র নির্ধারণ করা কঠিন। দীর্ঘস্থায়ী রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে সামরিক সরবরাহব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের হামলা ভবিষ্যৎ যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।