সারাবিশ্ব
বিদেশি সেনামুক্ত মধ্যপ্রাচ্য চায় তেহরান: আরাঘচি
মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিদেশি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাঘচি। একই সঙ্গে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। আরাঘচির দাবি, বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করার পরিবর্তে নিরাপত্তাহীনতা বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব উদ্যোগে নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইনস্টিটিউট ফর পলিটিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (আইপিআইএস) প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন আরাঘচি। ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কৌশলগত পরিষদের সাবেক প্রধান কামাল খাররাজির স্মরণে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বিদেশি শক্তির সামরিক উপস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন ইরানের এই শীর্ষ কূটনীতিক।
অনুষ্ঠানে আরাঘচি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিজেদের উদ্যোগে নেওয়া যেকোনো নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে স্বাগত জানায় তেহরান। আঞ্চলিক দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হলে তা ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশি হস্তক্ষেপমুক্ত একটি শান্তিপূর্ণ নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। গত এক বছরের সংঘাত ও যুদ্ধ এ অঞ্চলের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নিরাপত্তাকাঠামোকে ব্যাহত করেছে। তাঁর ভাষায়, সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।
আরাঘচির অভিযোগ, বাইরের শক্তিগুলো মূলত ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ ও বিভক্তি তৈরির চেষ্টা করছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের তৎপরতা আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলার পথে বাধা সৃষ্টি করছে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে আরাঘচি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যকে এমন একটি পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে হবে, যেখানে এ অঞ্চলে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। তাঁর দাবি, এসব বাহিনী ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু তাদের অব্যাহত উপস্থিতি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়াচ্ছে। তাই আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে কামাল খাররাজির মৃত্যুর বিষয়টিও উঠে আসে। তিনি ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং দেশটির পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কৌশলগত পরিষদের সাবেক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে আসছে ইরান। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও ঘটনার স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
আরাঘচির বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়ে ইরানের দীর্ঘদিনের অবস্থান আবারও সামনে এসেছে। তেহরান চায়, আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই গ্রহণ করুক এবং বিদেশি সামরিক উপস্থিতির পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করুক। তবে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং চলমান সংঘাত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।