সারাদেশ

সার ডিলার নিয়োগে ৯ জনের সবাই বিএনপি নেতাকর্মী


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম

সার ডিলার নিয়োগে ৯ জনের সবাই বিএনপি নেতাকর্মী
ছবি: সংগৃহীত

কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় বিসিআইসি সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। দুই উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে নতুন নিয়োগ পাওয়া নয়জনের প্রত্যেকেই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী অথবা দলটির নেতাদের স্বজন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেত্রী, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের পদধারী নেতা এবং তাঁদের স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজন। এ ছাড়া কয়েকজনের ক্ষেত্রে নিজ ইউনিয়নে বসবাসের শর্ত, সার সংরক্ষণের উপযোগী গুদাম এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কৃষকদের স্বার্থে প্রণীত নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রৌমারী ও চর রাজিবপুরের নয়টি ইউনিয়নে বিসিআইসি সার ডিলার হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত নয়জনের প্রত্যেকের সঙ্গে বিএনপির প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা অথবা পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের পদে দায়িত্ব পালন করছেন, আবার কেউ বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের পরিবারের সদস্য। তবে নিয়োগপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁদের যোগ্যতা, আবেদন যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এবং সরকারি নীতিমালার শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েই মূলত বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

রৌমারী সদর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন মেসার্স মমতাজ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মমতাজ হোসেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক। নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্রে তাঁর ঠিকানা দক্ষিণ টাপুরচর উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দক্ষিণ টাপুরচর রৌমারী সদর ইউনিয়নের নয়, বরং বন্দবেড় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত বলে জানা গেছে। ফলে নিজ ইউনিয়নে বসবাসের শর্ত তাঁর ক্ষেত্রে যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বন্দবেড় ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন মেসার্স আরাফ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আলমগীর হোসেন। তিনি রৌমারী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হাশেমের ভাগ্নে। অভিযোগ রয়েছে, আলমগীর হোসেনের নিজস্ব কোনো সার সংরক্ষণাগার নেই। ‘নৌবন্দর আবাসিক হোটেল’ নামের একটি ভবনকে গুদাম হিসেবে দেখিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের জন্য বরাদ্দ সার সংরক্ষণ এবং সেখান থেকে নিয়ম মেনে সার বিতরণের ক্ষেত্রে ভবনটি আদৌ উপযুক্ত কি না, তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে গুদাম পরিদর্শন, অনুমোদিত নথিপত্র এবং নিয়োগসংক্রান্ত যাচাই প্রতিবেদন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

যাদুরচর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছে মেসার্স জমজম ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী হাসনা হেনা কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সদস্য এবং কুড়িগ্রাম-৪ আসনে দলটির মনোনয়নপ্রাপ্ত আজিজুর রহমানের স্ত্রী। তাঁর নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয় আলোচনায় এসেছে। তবে তাঁর যোগ্যতা এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সব শর্ত পূরণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত যাচাই প্রয়োজন।

রৌমারীর অন্যান্য ইউনিয়নেও নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা চলছে। দাঁতভাঙা ইউনিয়নে মেসার্স স্বাধীন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. স্বাধীন হোসেন ডিলারশিপ পেয়েছেন। তিনি উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। শৌলমারী ইউনিয়নে মেসার্স নাইম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নাজমুল হুদা ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি ইউনিয়ন যুবদলের সদস্যসচিব। অন্যদিকে চরশৌলমারী ইউনিয়নে মেসার্স সম্রাট অ্যালুমিনিয়াম স্টোরের স্বত্বাধিকারী আহমেদ নুরে আলম ফেরদৌস ডিলারশিপ পেয়েছেন। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক।

এদিকে রাজিবপুর উপজেলাতেও একই ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। রাজিবপুর ইউনিয়নে মেসার্স রিতা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোছা. রেজিনা তাসরিন ডিলারশিপ পেয়েছেন। তিনি কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সদস্য ও রাজিবপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোখলেছুর রহমানের স্ত্রী। কোদালকাটি ইউনিয়নে মেসার্স সোহান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সোহানুর রহমান ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি। আর মোহনগঞ্জ ইউনিয়নে মেসার্স মণ্ডল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. শাহাজালাল তারেক ডিলারশিপ পেয়েছেন। তিনিও ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এভাবে রৌমারী ও রাজিবপুরের নয়টি ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া নয়জনের প্রত্যেকের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক অথবা পারিবারিক সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। বিষয়টি সামনে আসার পর নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা কোনো নেতার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেই নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ যাচাই করতে হলে আবেদনকারীদের যোগ্যতা, মূল্যায়নের মানদণ্ড, গুদাম ও ঠিকানাসংক্রান্ত নথিপত্র এবং চূড়ান্ত তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা জরুরি।

উপজেলা কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সার ডিলারশিপের জন্য রৌমারী উপজেলায় ১৪৫ জন এবং রাজিবপুর উপজেলায় ৫৫ জন আবেদন করেছিলেন। অর্থাৎ দুই উপজেলায় মোট ২০০টি আবেদন জমা পড়ে। এর বিপরীতে নয়টি ইউনিয়নে শেষ পর্যন্ত নয়জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর মধ্য থেকে নির্বাচিত ব্যক্তিদের যোগ্যতা কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, কোন কোন শর্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি সার বিতরণ নীতিমালায় নির্ধারিত স্থানে সার সংরক্ষণের উপযোগী গুদাম থাকা এবং নিজ ইউনিয়নে বসবাসের মতো শর্ত রয়েছে। কিন্তু নিয়োগপ্রাপ্ত কয়েকজনের ঠিকানা ও গুদামসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় নীতিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কোনো আবেদনকারীর গুদাম সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না, নথিতে উল্লেখ করা ঠিকানা যাচাই করা হয়েছে কি না এবং যোগ্যতার সব শর্ত পূরণ না হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে-এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের মতে, সার ডিলার নিয়োগের সঙ্গে সরাসরি কৃষকদের স্বার্থ জড়িত। কারণ, ডিলারদের মাধ্যমে কৃষকেরা সরকারি ব্যবস্থাপনায় বরাদ্দ সার সংগ্রহ করেন। এ ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত প্রভাবের পরিবর্তে নির্ধারিত যোগ্যতা, গুদাম সুবিধা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং নীতিমালার শর্তের ভিত্তিতে ডিলার নির্বাচন করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক মমতাজ হোসেন কালবেলাকে বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বিএনপি নেতাদেরই ডিলারশিপ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এ সময় প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বিএনপি নেতারা না পেলে ডিলারশিপ আর কারা পাবেন?

অন্যদিকে, জেলা বিএনপির সদস্য আজিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, সবাইকে না দিয়ে দু-একজনকে দলের বাইরে থেকে নিয়োগ দেওয়া হলে ভালো হতো। তবে তাঁর স্ত্রীর নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি সব শর্ত মেনে চলা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

দলীয়করণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ্ মো. রওশন কবির। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাই শেষে যে তালিকা পাঠানো হয়েছে, জেলা পর্যায় থেকে সেই তালিকাই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখানে দলীয়করণের কোনো সুযোগ নেই।’

তবে নিয়োগপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয়, কয়েকজনের ঠিকানা ও গুদামসংক্রান্ত অভিযোগ এবং বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর মধ্য থেকে চূড়ান্ত তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিষয়ে বিস্তারিত যাচাইয়ের দাবি রয়ে গেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা এবং নীতিমালার শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা গেলে বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।