সারাবিশ্ব
ইরানে নতুন হামলা নিয়ে নেতানিয়াহু-সেনাপ্রধানের বিরোধ
ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়াল জামিরের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। সামরিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ, এর আইনি বৈধতা এবং সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এই বিরোধ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল ১২। দেশটির নির্বাচনের ঠিক আগে এমন খবর সামনে আসায় রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে চ্যানেল ১২ জানায়, নেতানিয়াহুর দেওয়া সামরিক অভিযানের নির্দেশ কার্যকর করতে সম্মত হননি সেনাপ্রধান জামির। এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আরও আলোচনা ও পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত অভিযানের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করে একটি লিখিত নথিতে নেতানিয়াহুর স্বাক্ষর চেয়েছিলেন জামির বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঠিক কী ধরনের অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে নতুন করে হামলার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করেই এই মতবিরোধের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত সামরিক পদক্ষেপের লক্ষ্য, পরিধি কিংবা সম্ভাব্য সময়সীমা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য সামনে আসেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে কী ধরনের আলোচনা হয়েছে, তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
নির্বাচনের ঠিক আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের মধ্যে এই বিরোধের খবর সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মঙ্গলবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহু ও তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন সামরিক অভিযান এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে এক সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত অভিযান ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। ওই কর্মকর্তা মনে করেন, এমন স্পর্শকাতর সময়ে এ ধরনের পদক্ষেপ ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি ইরান ইস্যুকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
অন্যদিকে, টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চ্যানেল ১৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর আগে আরেকটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে কাজ করতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এবং দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্য ইরানকে ঘিরে ইসরায়েলের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
এদিকে, ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো। তাঁরা একসঙ্গে বিভিন্ন সামরিক অভিযানে সফল হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। ট্রাম্পের এই বক্তব্য নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থনের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
নিজের পোস্টে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে পরিচালিত ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, ইরানের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তাঁর আরও দাবি, ইরানের সামরিক বাহিনী ও অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে এসব বক্তব্য ট্রাম্পের নিজস্ব দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের ওপর নৌ অবরোধের কারণে দেশটি তেল পাচ্ছে না বলেও দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের দুটি স্তরই হারিয়ে গেছে। ইসরায়েলের জনগণের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় নেতানিয়াহুকে দক্ষ ও সাহসী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে শুরু করা সামরিক পদক্ষেপের লক্ষ্য পূরণে নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি এবং নির্বাচনে তাঁকে ভোট দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন।
নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর প্রচারেও ইরান ইস্যু গুরুত্ব পেয়েছে। নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে, রোববার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি একটি ছবি প্রকাশ করেন তিনি। ছবিতে তেল আবিবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখানো হয়। ছবিটি প্রকাশ করে নেতানিয়াহু সতর্ক করেন, তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে ভোট দেওয়া হলে ইসরায়েলিরা ‘দ্বিতীয় হলোকাস্টের’ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাঁর এই বক্তব্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা-উদ্বেগ নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে উঠে আসে।
নেতানিয়াহুর পোস্টে ডানপন্থী কর্মী ইউভাল ব্লুমবার্গের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, ইসরায়েল সরাসরি অস্তিত্বের হুমকির মুখে রয়েছে এবং ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আমূল বদলে যেতে পারে। পোস্টে আরও বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শেষ করতে ট্রাম্পের হাতে আরও দুই বছর সময় রয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে কে আসবেন, তা নিশ্চিত নয়। এ কারণে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে সেখানে যুক্তি তুলে ধরা হয়।
একই পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে সক্ষম এমন একজন প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলের প্রয়োজন বলেও দাবি করা হয়। এতে ইরানকে ঘিরে নিরাপত্তা-উদ্বেগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককেও নির্বাচনী বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক হুমকি নিয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্য এবং তাঁর নির্বাচনী প্রচারের দাবিগুলোকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত নির্বাচনের সর্বশেষ পূর্বাভাসে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন জোট কিংবা বিরোধী জোট-কোনোটিই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানে নতুন সামরিক অভিযান নিয়ে নেতানিয়াহু ও সেনাপ্রধানের কথিত মতবিরোধ, ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নেতানিয়াহুর সতর্কবার্তা-সবকিছুই নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে বিরোধের প্রকৃত কারণ, প্রস্তাবিত অভিযানের বিস্তারিত পরিকল্পনা এবং নির্বাচনের ফলাফলে এসব ঘটনার প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ওপর।