রাজনীতি
ভারতের সঙ্গে গোপন আঁতাত করছে সরকার: নাহিদ ইসলাম
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, সরকার ভারতের সঙ্গে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে বাংলাদেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে হবে। একই সঙ্গে সাবেক তিনটি সংসদকে অবৈধ ঘোষণা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে পুরোনো সাংবিধানিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান তিনি।
রোববার রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বরে এক সংক্ষিপ্ত পথসভায় এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামী ৩০ অক্টোবরের বিক্ষোভ মিছিল সফল করার লক্ষ্যে এ কর্মসূচির আয়োজন করে এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা। পথসভার পাশাপাশি এলাকায় লিফলেট বিতরণ করেন দলটির নেতাকর্মীরা।
তিনটি সংসদকে অবৈধ ঘোষণার দাবি
বিগত তিনটি সংসদকে অবৈধ ঘোষণা করার দাবি জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি শেখ হাসিনার আমলের তিনটি সংসদকে অবৈধ বলে মনে করে। এনসিপিও সেগুলোকে অবৈধ মনে করে। তবে বিএনপি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ওই সংসদগুলোকে অবৈধ ঘোষণা না করায় আইনগতভাবে বিষয়টি সেভাবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে আগের সংসদগুলোর ধারাবাহিকতা এবং পুরোনো সাংবিধানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে নতুনভাবে বাংলাদেশকে পরিচালনা ও পুনর্গঠন করা সম্ভব।
তিনি সতর্ক করে বলেন, পুরোনো সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি সবচেয়ে ভালো সংশোধনী আনলেও ভবিষ্যতে সেই সংশোধনী বাতিল করে বর্তমান সরকার ও অন্তর্বর্তী সময়কে অবৈধ ঘোষণা করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অতীতে পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানকে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, একই ধরনের পরিস্থিতি ভবিষ্যতে তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও তৈরি হবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করেও অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা উচিত। পুরোনো সংসদ, আগের সরকারের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং ফ্যাসিবাদী কাঠামো থেকে বেরিয়ে একটি নতুন গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
পাহাড়ের অস্থিতিশীলতা নিয়ে সরকারের কাছে জবাব দাবি
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, সমতল থেকে পাহাড়-সব জায়গায় পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠছে। পার্বত্য অঞ্চলে কেন অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে সরকারকে সুস্পষ্ট বক্তব্য দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে তাঁরা কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, পাহাড়কে শান্ত ও স্থিতিশীল রাখতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে কারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কীভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে এবং কী ধরনের ষড়যন্ত্রের চেষ্টা হচ্ছে, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে। কারণ, বিষয়টি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গে গোপন আঁতাতের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এই আঁতাতের কারণেই বিভিন্নভাবে পাহাড়কে অশান্ত করার চেষ্টা চলছে বলে তাঁরা মনে করেন। তাঁর দাবি, পার্বত্য অঞ্চলে কারা অস্ত্র সরবরাহ করে এবং কারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে, তা সম্পর্কে তাঁদের ধারণা রয়েছে। বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রয়োজন হলে প্রতিবেশী দেশটি পাহাড়ে অশান্তি তৈরি করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন-এমন তথ্য বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি।
সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ: আখতার হোসেন
পথসভায় এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার কোনোভাবেই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না। এরই মধ্যে দেশের গণতন্ত্র, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র তৈরি হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রসঙ্গে আখতার হোসেন বলেন, বিএনপি অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করলেও এখন সেই ব্যবস্থাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করছে। তাঁর অভিযোগ, অতীতে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার উদ্দেশ্যে বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানো হয়েছিল। এর পরিণতিতে বাংলাদেশে এক-এগারোর মতো রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কাঠামো প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছিল এনসিপি। এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনেও আলোচনা হয়েছে। ‘র্যাঙ্কড টাইপ ভোটিং সিস্টেম’-এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছিল বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব গণভোটেও পাস হয়েছে।
আখতার হোসেনের অভিযোগ, এখন বিএনপি সরকার নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের পথ তৈরি করছে। স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাবের সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা একজন ব্যক্তিকে এ পদে বসানো হলে সেই সরকার কীভাবে নির্দলীয় হবে?
তিনি আরও বলেন, স্পিকারের অতীত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলীয় কার্যক্রম ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকে। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দলের পদ বা সদস্যপদ ছেড়ে দিলেও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত কর্মকাণ্ডের বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না। এ অবস্থায় তাঁকেই কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করতে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এনসিপির সদস্যসচিব।
জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: আখতার
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে আখতার হোসেন বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। অথচ এখন সংবিধান রক্ষার নামে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনগণের বিপক্ষে গিয়ে ফ্যাসিবাদী সংবিধান রক্ষা করতেও ব্যর্থ হবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মিরপুরে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগ আসিফ মাহমুদের
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলটির মেয়রপ্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া মিরপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর মিরপুরের পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এলাকাটি বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও মাফিয়া গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এসব গোষ্ঠীর তৎপরতায় সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বলেও দাবি করেন এই নেতা।
মিরপুরের একটি ক্লিনিকে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে আসিফ মাহমুদ বলেন, ওই ঘটনার পর একজন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করতে বলা হলেও হামলার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, এর মাধ্যমে এলাকায় সক্রিয় মাফিয়া গোষ্ঠীগুলোকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আগে চাঁদাবাজি নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মার্কেটকেন্দ্রিক থাকলেও এখন তা গ্রামগঞ্জের অলিগলি, পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি মহিষকে ঘাস খাওয়ানো কিংবা পুকুরে মাছের খাবার দেওয়ার মতো বিষয়েও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠছে। চাঁদাবাজির মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আসিফ মাহমুদ বলেন, সরকারের একাংশ লুটপাটে ব্যস্ত, অন্য অংশ ক্যামেরার সামনে অভিযান পরিচালনা করলেও পরে অভিযুক্তদের সঙ্গে সমঝোতা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন বার ও প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত অভিযানকে স্বাগত জানালেও অভিযানের পর সেখানে আবারও লেনদেনের অভিযোগ ওঠায় প্রশ্ন তোলেন তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন এনসিপির এই নেতা।
মিরপুরকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য করার অভিযোগ সারোয়ার তুষারের
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার মিরপুরকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর তৎপরতায় এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সম্প্রতি মিরপুরে সংঘটিত একটি ভাঙচুরের ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী ও জড়িত ব্যক্তিদের আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সারোয়ার তুষার। তাঁর দাবি, ওই ঘটনায় একজন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করতে হলেও অভিযুক্ত একজন প্রতিমন্ত্রী, একজন উপদেষ্টা ও আরেক নারী সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে হামলায় জড়িত সন্ত্রাসীদেরও গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে কারসাজির অভিযোগ
সংবিধান সংশোধন কমিটির মাধ্যমে আগামী নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে কারসাজি এবং নির্বাচনকে প্রভাবিত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন সারোয়ার তুষার। তাঁর দাবি, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একদলীয় ও বাকশালী সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে আগামী নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার পরিকল্পনা করছেন।
তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার পরিকল্পনা এখন থেকেই করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সামনে উপনির্বাচন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন রয়েছে উল্লেখ করে সরকারকে সতর্ক করেন এনসিপির এই নেতা। মাগুরার উপনির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানান তিনি।
সারোয়ার তুষার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সরকার যদি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দেশের মানুষ আবারও রাজপথে নেমে আসবে। তখন সংবিধান সংশোধন কিংবা অন্য কোনো উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পথসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সালেহ উদ্দিন সিফাত, নুসরাত তাবাসসুমসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।