জাতীয়
ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, বিপাকে পড়তে পারে যেসব এলাকার মানুষ
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপটি আরও শক্তিশালী হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। সম্ভাব্য এই ঘূর্ণিঝড়ের নাম হবে ‘অর্ণব’। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূলের দিকে আসার আশঙ্কা কম থাকলেও ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত হানতে পারে। তবে এর প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া পূর্বাভাসে এসব তথ্য জানানো হয়। পূর্বাভাস অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি আরও ঘনীভূত হয়ে সোমবার (২৬ অক্টোবর) ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। পরে এটি দিক পরিবর্তন করে পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। সম্ভাব্য গতিপথ অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি শক্তিশালী হয়ে বুধবার (২৮ অক্টোবর) নাগাদ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক জানিয়েছেন, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টির বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। বরং এটি ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতসহ আবহাওয়ার কিছু পরিবর্তন হতে পারে। তাই দেশের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার দুপুর ১২টায় গভীর নিম্নচাপটি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৮১০ কিলোমিটার দক্ষিণে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। এটি দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি আরও শক্তিশালী হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে গতিপথ পরিবর্তন করে পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গভীর নিম্নচাপটির কেন্দ্রের ৪৮ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার। দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে এই গতিবেগ ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিম্নচাপটির কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় সাগর উত্তাল রয়েছে। এ কারণে সমুদ্রগামী নৌযানগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে আগামী ২৭ অক্টোবর থেকে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। এরপর ২৯ অক্টোবর থেকে খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলেও বৃষ্টির প্রবণতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও বৃষ্টিপাতের বিস্তার ঘটতে পারে।
গভীর নিম্নচাপের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ১ নম্বর দূরবর্তী সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। গভীর সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের নাম ‘অর্ণব’ কেন?
বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার আঞ্চলিক প্যানেলের অন্তর্ভুক্ত ১৩টি দেশ। দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন। এসব দেশের প্রস্তাবিত নামের তালিকা থেকে নির্ধারিত ক্রমানুসারে ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেওয়া হয়।
প্রচলিত নামের তালিকা অনুযায়ী, পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়ের নাম ‘অর্ণব’। নামটি বাংলাদেশের প্রস্তাব করা, যার অর্থ সাগর। তবে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে সক্রিয় নিম্নচাপগুলোর মধ্যে যে ব্যবস্থাটি আগে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেবে, সেটিই এই নাম পাবে। এরপরের নাম ‘মুরাসু’, যা ভারতের প্রস্তাবিত। তামিল ভাষায় ‘মুরাসু’ বলতে ঐতিহ্যবাহী ঢোল বা ডঙ্কাকে বোঝায়।
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের মূল উদ্দেশ্য হলো আবহাওয়ার পূর্বাভাস, সতর্কবার্তা এবং জনসাধারণের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সহজ করা। একই সময়ে একাধিক ঘূর্ণিঝড় সক্রিয় থাকলে নামের মাধ্যমে সেগুলো সহজে শনাক্ত করা যায় এবং সংশ্লিষ্ট সতর্কবার্তা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা সম্ভব হয়।
পাঁচ দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস
এদিকে রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পূর্বাভাস অনুযায়ী, রোববার চট্টগ্রাম বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আকাশ আংশিক মেঘলা থাকলেও আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে।
সোমবার চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আকাশ আংশিক মেঘলা থাকলেও আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে।
মঙ্গলবার খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া রাজশাহী, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে।
বুধবার রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ সময় দেশের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণও হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিলে বাংলাদেশের উপকূলে সরাসরি আঘাত হানার আশঙ্কা কম থাকলেও এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। তাই উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা, জেলেসহ সমুদ্রগামী নৌযানগুলোকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস ও সতর্কসংকেত অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।