জাতীয়

ই-টিন থাকলেই গুনতে হচ্ছে ৫ হাজার টাকা জরিমানা


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম

ই-টিন থাকলেই গুনতে হচ্ছে ৫ হাজার টাকা জরিমানা
ছবি: সংগৃহীত

ই-টিন থাকলেই কি দিতে হবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা? আয়কর আইন কী বলছে, কারা রিটার্ন দিতে বাধ্য এবং আয় না থাকলে করণীয় কী-জেনে নিন বিস্তারিত।

ই-টিন (e-TIN) রয়েছে, অথচ আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি-এমন পরিস্থিতিতে কি গুনতে হবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা? বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে শুধু ই-টিন থাকলেই প্রত্যেকের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা আরোপ করা হয় না। আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়া হয়েছে কি না এবং করদাতার পূর্ববর্তী কর নির্ধারণের অবস্থা-এসব বিষয় বিবেচনা করেই আইন অনুযায়ী জরিমানা নির্ধারণ করা হয়।

রিটার্ন জমা না দিলে কত টাকা জরিমানা হতে পারে?

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারায় আয়কর রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার জন্য জরিমানার বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী, যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া নির্ধারিত বিধানের আওতায় রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণে করদাতার সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করা কর এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।

আইনের ২৬৬(১) ধারা অনুযায়ী, আগে কখনো আয় নিরূপণ করা হয়নি-এমন ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে, আগে আয় নিরূপণ হয়ে থাকলে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১ হাজার টাকা-দুটির মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। একই ধারায় ন্যূনতম ১ হাজার টাকা জরিমানা এবং রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ টাকা জরিমানার বিধানও রয়েছে। তবে আইনে নির্ধারিত শর্ত ও সীমা অনুযায়ীই জরিমানা প্রযোজ্য হবে।

অর্থাৎ, ই-টিনধারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণে একই অঙ্কের জরিমানা দিতে হবে-এমন ধারণা সঠিক নয়। জরিমানা আরোপের আগে সংশ্লিষ্ট আইনগত বিধান ও করদাতার পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা কত?

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য প্রচারিত হচ্ছে। সংশোধিত বাজেট প্রস্তাব ও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নারী ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী করদাতাদের জন্য এই সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের ক্ষেত্রে সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

উল্লেখ্য, করমুক্ত আয়ের সীমা এবং রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এক বিষয় নয়। কারও আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও নির্দিষ্ট আইনগত শর্ত, পেশা বা সেবা গ্রহণের কারণে তাঁর রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। তাই শুধু বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার নিচে রয়েছে বলে রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই-এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে আয়করের হার কত?

প্রকাশিত করকাঠামো অনুযায়ী, সাধারণ ব্যক্তি করদাতার প্রথম ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত। পরবর্তী ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, এর পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ হারে আয়কর প্রযোজ্য। এরপর অবশিষ্ট করযোগ্য আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর নির্ধারণের বিধান রয়েছে।

এখানে মনে রাখতে হবে, করের হার প্রয়োগ করা হয় সংশ্লিষ্ট করদাতার করযোগ্য আয়ের নির্ধারিত স্তর অনুযায়ী। পুরো আয়ের ওপর একই হারে কর আরোপ করা হয় না। এ ছাড়া প্রযোজ্য কর রেয়াত, সারচার্জ বা অন্যান্য আইনগত বিধান থাকলে চূড়ান্ত করের পরিমাণে তার প্রভাব পড়তে পারে।

কারা আয়কর রিটার্ন জমা দিতে বাধ্য?

বাংলাদেশে আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা কেবল ই-টিন থাকার ওপর নির্ভর করে না। আয়কর আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আয়সীমা অতিক্রম করা, নির্দিষ্ট পেশা বা পদে থাকা কিংবা নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রমাণপত্র প্রয়োজন হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে।

সাধারণভাবে যাঁদের রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নির্ধারিত করমুক্ত সীমার বেশি আয় করা ব্যক্তি, ফার্মের অংশীদার, কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক এবং আইন অনুযায়ী নির্ধারিত অন্যান্য শ্রেণির করদাতা। এ ছাড়া সরকারি চাকরিজীবীসহ নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি এবং ব্যাংকঋণ, ক্রেডিট কার্ড, জমি বা সম্পত্তি নিবন্ধন কিংবা অন্যান্য নির্ধারিত সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যাঁদের রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র প্রয়োজন, তাঁদেরও প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হয়।

তবে এসব ক্ষেত্রে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। সংশ্লিষ্ট সেবার ধরন, আইনগত শর্ত এবং করদাতার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা নির্ধারিত হতে পারে।

আয় নেই, তবুও ই-টিন রয়েছে-করণীয় কী?

অনেকেই চাকরি, ব্যবসা, ব্যাংকিং কার্যক্রম কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে ই-টিন নিবন্ধন করেছেন। পরবর্তী সময়ে চাকরি হারানো, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা আয় কমে যাওয়ার কারণে তাঁদের আয় শূন্য হতে পারে কিংবা করমুক্ত সীমার নিচে নেমে আসতে পারে। কিন্তু আয় না থাকা বা আয়কর দিতে না হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সব ক্ষেত্রেই রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে যাচাই করতে হবে, বর্তমান আইন অনুযায়ী ওই ব্যক্তির রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক কি না। বাধ্যবাধকতা থাকলে প্রযোজ্য নিয়ম মেনে রিটার্ন জমা দিতে হবে। অন্যদিকে, ই-টিনের আর প্রয়োজন না থাকলে এবং আইনগত শর্ত পূরণ হলে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে টিআইএন বাতিল বা নিষ্ক্রিয় করার বিষয়ে আবেদন করা যেতে পারে। তবে আবেদন করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিআইএন বাতিল হবে না; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে।

বকেয়া রিটার্ন রয়েছে কি না, যেভাবে যাচাই করবেন

আপনার ই-টিনের বিপরীতে কোনো রিটার্ন বকেয়া রয়েছে কি না কিংবা করসংক্রান্ত কোনো সমস্যা আছে কি না, তা জানতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ই-রিটার্ন পোর্টাল etaxnbr.gov.bd-এ প্রবেশ করে প্রযোজ্য তথ্য যাচাই করতে পারেন। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল অফিসে যোগাযোগ করে নিজের করদাতা-সংক্রান্ত অবস্থান ও করণীয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত।

বিশেষ করে আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়নি, আয় করমুক্ত সীমার নিচে রয়েছে অথবা দীর্ঘদিন ধরে রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি-এমন পরিস্থিতিতে অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

আতঙ্কিত না হয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন

ই-টিন রয়েছে কিন্তু আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি-এমন পরিস্থিতিতে সবার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারিত নয়। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারায় রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার জন্য জরিমানার বিধান থাকলেও তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনগত শর্ত, পূর্ববর্তী আয় নিরূপণের অবস্থা এবং প্রযোজ্য সীমা বিবেচনা করতে হয়।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য দেখে আতঙ্কিত না হয়ে নিজের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা যাচাই করুন। রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক হলে তা অবহেলা না করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের করমুক্ত আয়ের সীমা ও করহার প্রয়োগের ক্ষেত্রে এনবিআরের সর্বশেষ নির্দেশনা এবং কার্যকর সরকারি আইন বা প্রজ্ঞাপন অনুসরণ করুন।