সারাবিশ্ব

আমদানি নির্ভরতা থেকে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা: যেভাবে বদলে যাচ্ছে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম

আমদানি নির্ভরতা থেকে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা: যেভাবে বদলে যাচ্ছে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প
ছবি: সংগৃহীত

ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সামরিক প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে ভারত। সামরিক সরঞ্জামের আমদানিনির্ভরতা কমানো, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। উদ্ভাবন, গবেষণা, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং কৌশলগত সংস্কারের মাধ্যমে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাত এখন নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল বিদেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম আমদানি কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা। তবে সময়ের সঙ্গে এই কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। এখন শুধু বিদেশি সরঞ্জামের বিকল্প তৈরি নয়, বরং উন্নত সামরিক প্রযুক্তির নকশা, গবেষণা, উন্নয়ন ও উৎপাদনে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি বাড়ানোও ভারতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

ভারতের প্রতিরক্ষা ও অ্যারোস্পেস শিল্পে এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রবৃদ্ধিতে। বিটি-ডেলয়েট ইন্ডিয়ার এক জরিপে উঠে এসেছে, গত পাঁচ বছরে দেশটির অ্যারোস্পেস ও প্রতিরক্ষা খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। জরিপ অনুযায়ী, এ খাতের ২৬টি তালিকাভুক্ত কোম্পানি ২০২৬ অর্থবছরে সম্মিলিতভাবে ২৩ হাজার ১১১ কোটি রুপি নিট মুনাফা অর্জন করেছে। ২০২১ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৫০৭ কোটি রুপি। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে প্রায় ২০৮ শতাংশ।

শুধু বড় প্রতিষ্ঠান নয়, তুলনামূলক ছোট ও বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নির্মাতা কোম্পানিগুলোর মধ্যেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এসিই ইকুইটির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ভারতের একাধিক অ্যারোস্পেস, প্রতিরক্ষা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর মধ্যে জেন টেকনোলজিসের প্রবৃদ্ধি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ২০২১ অর্থবছরে মাত্র ২ দশমিক ৮ কোটি রুপি থাকলেও ২০২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ২১৭ দশমিক ৯ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বৃদ্ধির হার ৭ হাজার ৭৫৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া জে কে এন্টারপ্রাইজেসের নিট মুনাফা বেড়েছে ৭২৭ শতাংশ। অ্যাস্ট্রা মাইক্রোওয়েভ প্রোডাক্টসের মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে ৫৬৯ শতাংশ এবং সোলার ইন্ডাস্ট্রিজ ইন্ডিয়ার মুনাফা বেড়েছে ৫০৩ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়।

দেশটির বৃহৎ প্রতিরক্ষা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ফলাফলও একই প্রবণতা তুলে ধরছে। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান ও অ্যারোস্পেস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড (এইচএএল) ২০২৬ অর্থবছরে ৯ হাজার ১১৫ দশমিক ৫ কোটি রুপি নিট মুনাফা অর্জনের কথা জানিয়েছে। ২০২১ অর্থবছরের তুলনায় এই মুনাফা ১৮১ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিকস খাতের প্রতিষ্ঠান ভারত ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের নিট মুনাফা ১৯১ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ২৩ দশমিক ৫ কোটি রুপিতে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাজাগাঁও ডক শিপবিল্ডার্সের নিট মুনাফা বেড়েছে ৪৩৪ শতাংশ, যা ২০২৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৪২১ দশমিক ৯ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে।

ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের এই প্রবৃদ্ধির পেছনে সরকারি ক্রয়নীতি ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গত সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদ ১ লাখ ১০ হাজার কোটি রুপির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়। এ প্রস্তাবের আওতায় প্রায় ৯৮ শতাংশ সরঞ্জাম দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫ থেকে ২০২৭ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার অনুমোদিত প্রস্তাবের মোট মূল্য প্রায় ১৩ লাখ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে বলে জানানো হয়েছে।

দেশীয় কোম্পানিগুলোর জন্য সরকারি ক্রয়াদেশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে গবেষণা, পরীক্ষা, উৎপাদন অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়াদেশ থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও দক্ষ জনবল তৈরিতে বিনিয়োগের সুযোগ পায়। তবে এই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; পণ্যের গুণগত মান, প্রযুক্তিগত নির্ভরযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক মান পূরণের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।

ডেলয়েট ইন্ডিয়ার স্ট্র্যাটেজি, রিস্ক অ্যান্ড ট্রানজ্যাকশনস বিভাগের পার্টনার অ্যালারিক ডিনিজের মতে, ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগের পরবর্তী পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরি, টেকসই মূল্য সংযোজন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী প্রযুক্তি উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব বাড়বে। বিশেষ করে এমন প্রযুক্তি, যেগুলো সামরিক ও বেসামরিক-উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যায়, সেগুলো ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালকবিহীন আকাশযান (ইউএভি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং এআই-চালিত রাডারের মতো প্রযুক্তির কৌশলগত গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তি শুধু সামরিক অভিযানে নয়, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, নজরদারি, যোগাযোগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য বেসামরিক কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে দ্বৈত-ব্যবহারের প্রযুক্তি ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিরক্ষা খাত যত বেশি পরিপক্ক ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে, ততই এ খাতে নতুন চুক্তি, বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক লেনদেনের সুযোগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিযোগ্য প্রযুক্তি, দ্বৈত-ব্যবহারের পণ্য এবং সহজে উৎপাদন সম্প্রসারণ করা যায়-এমন ব্যবসায়িক মডেলের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প এখন শুধু আমদানি বিকল্প তৈরির পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং নিজস্ব প্রযুক্তির উন্নয়ন, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করার দিকে এগোচ্ছে। তবে এই রূপান্তরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তির ওপর দেশীয় নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনের গুণগত মান এবং রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর। আর্থিক প্রবৃদ্ধি এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জনই হবে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি।