সারাবিশ্ব
তেহরানে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার, বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হওয়ার মধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যেই তেহরানে শুরু হয়েছে আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের আলোচনা। এতে সংঘাত এড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে জ্বালানিবাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে দাম কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৯টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১১৪ দশমিক ৮২ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের ফিউচার মূল্য ২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ১৯ ডলারে দাঁড়ায়। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সংঘাতের ঝুঁকি কিছুটা হ্রাস পাওয়ার প্রত্যাশা তেলের দামের এই পতনে ভূমিকা রেখেছে।
তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের বৈঠক শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা, আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন এবং সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানোর উপায় নিয়ে এই কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে-এমন আশঙ্কার মধ্যে বৈঠকটিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে রোববার কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা আঞ্চলিক অস্থিরতা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তেহরান সফর করেন। ওই সফরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে যায়। ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা কমতে পারে—বাজারে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে আলোচনার অগ্রগতি এবং এর বাস্তব ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তেলের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়। ফলে অঞ্চলটিতে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তেল উৎপাদন, রপ্তানি এবং পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগরকে আন্তর্জাতিক জলপথের সঙ্গে যুক্ত করা এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। সেখানে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলে বাধা কিংবা নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে অপরিশোধিত তেলের দাম, জ্বালানি পরিবহন ব্যয় এবং বিভিন্ন দেশের জ্বালানি আমদানি খরচের ওপর।
অন্যদিকে, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো সম্ভব হলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার বিষয়ে বাজারের আস্থা বাড়তে পারে। এতে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা কমে এবং তেলের দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে। তেহরানে চলমান বৈঠক এবং কাতারের মধ্যস্থতার উদ্যোগকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক দরপতনের পেছনে এমন প্রত্যাশা কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে তেলের দাম কমলেও বাজারের পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্বাভাবিক বলা যাচ্ছে না। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এখনো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের অনেক ওপরে রয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দামও ১০০ ডলারের বেশি। ফলে সাম্প্রতিক দরপতনকে বড় ধরনের মূল্যহ্রাসের পরিবর্তে কূটনৈতিক অগ্রগতির প্রত্যাশায় সাময়িক স্বস্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের খরচও বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিপরীতে, তেলের দাম কমলে আমদানিকারক দেশগুলো কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতনের সুফল স্থানীয় বাজারে কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নির্ভর করে আমদানি ব্যয়, মুদ্রার বিনিময় হার, কর এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ খরচের ওপর।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, আগামী দিনগুলোতে তেলের বাজারের গতিপথ নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহনের স্বাভাবিকতা বড় ভূমিকা রাখবে। কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হলে কিংবা নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে তেলের দাম আবারও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, তেহরানে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হওয়ার মধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে কিছুটা পতন দেখা গেছে। তবে দাম এখনো উচ্চ পর্যায়ে থাকায় জ্বালানিবাজারের অনিশ্চয়তা কাটেনি। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের পরবর্তী গতিপ্রকৃতির ওপরই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও কমবে, নাকি নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হবে।