সারাবিশ্ব

ইসরাইলি কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন ‘গরিবের ডাক্তার’ মাজেন আল-রানতিসি


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০২ পিএম

ইসরাইলি কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন ‘গরিবের ডাক্তার’ মাজেন আল-রানতিসি
ছবি: সংগৃহীত

ফিলিস্তিনের দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের কাছে ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত চিকিৎসক মাজেন আল-রানতিসিকে প্রায় চার মাস আটক রাখার পর মুক্তি দিয়েছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। অধিকৃত পশ্চিম তীরের কুখ্যাত ওফার কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ৭২ বছর বয়সী এই চিকিৎসকের শীর্ণকায় চেহারা ও কপালে স্পষ্ট লাল ক্ষতচিহ্নের ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নির্যাতন ও শারীরিক নিপীড়নের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনার মুখে রয়েছে কারাগারটি।

রোববার অধিকৃত পশ্চিম তীরের ওফার কারাগার থেকে মাজেন আল-রানতিসিকে মুক্তি দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে তিনি ফিলিস্তিনিদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। আর্থিক সংকটে থাকা বহু রোগীকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন তিনি। তার মুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার শারীরিক অবস্থা এবং আটকের সময় কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে।

গত ২১ জুন অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লার আল-তিরা এলাকায় অবস্থিত তার বাড়িতে ভোররাতে অভিযান চালায় ইসরাইলি বাহিনী। ওই অভিযানের সময় তাকে আটক করা হয়। তবে আটকের পরপরই তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি তাকে কোথায় রাখা হয়েছে, তা নিয়েও দীর্ঘ সময় স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তার পরিবার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

পরে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি অলাভজনক সংস্থা ইউনিয়ন অব হেলথ ওয়ার্ক কমিটিজের (ইউএইচডব্লিউসি) পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিযোগে অভিযোগপত্র দাখিল করে। সংস্থাটি ফিলিস্তিনের বিভিন্ন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং প্রতি বছর হাজারো মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে। তবে এ অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ কিংবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চিকিৎসকটির বক্তব্য সম্পর্কে প্রতিবেদনে কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নিম্ন আয়ের ও অসচ্ছল রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন মাজেন আল-রানতিসি। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় কেউ যাতে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিতেন তিনি। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীদের কাছ থেকে চিকিৎসার ফি নিতেন না। প্রয়োজন অনুযায়ী বিনা মূল্যে ওষুধ সরবরাহের পাশাপাশি বিনা খরচে চিকিৎসাসেবাও দিতেন। এ কারণে রামাল্লায় তার ক্লিনিকটি দরিদ্র মানুষের কাছে আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।

রোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্লিনিকের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পরও রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এই চিকিৎসক। ফোনকল ও বিভিন্ন বার্তাপ্রেরণ অ্যাপের মাধ্যমে তিনি চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ দিতেন। এসব সেবার জন্যও অনেক সময় কোনো অর্থ নিতেন না। ফলে শুধু চিকিৎসক হিসেবেই নয়, বরং অসহায় মানুষের বিপদের সময়ে নির্ভরযোগ্য সহায়তাকারী হিসেবেও তিনি পরিচিতি অর্জন করেন।

মাজেন আল-রানতিসিকে আটকের ঘটনায় অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে নিন্দা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। তার পরিবারের সদস্য, সহকর্মী ও রোগীরা আটকের কারণ, অবস্থান এবং শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য প্রকাশের দাবি জানান। একই সঙ্গে তার অবিলম্বে মুক্তির আহ্বান জানান তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার মুক্তির দাবিতে সরব হন অধিকারকর্মীরা।

এ সময় ‘ফ্রিডম ফর ড. মাজেন আল-রানতিসি’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংহতি অভিযান চালানো হয়। তার দীর্ঘদিনের মানবিক চিকিৎসাসেবার কথা তুলে ধরে অনেকে আটকাবস্থায় তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। মুক্তির পর প্রকাশিত ছবিতে তার শীর্ণকায় চেহারা ও কপালের ক্ষতচিহ্ন সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

ফিলিস্তিনে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘাত ও দখলদারত্বের প্রেক্ষাপটে চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। মাজেন আল-রানতিসির আটকের ঘটনাও সেই প্রেক্ষাপটে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই চিকিৎসকের মুক্তির মধ্য দিয়ে তার পরিবারের পাশাপাশি অসংখ্য রোগী ও শুভাকাঙ্ক্ষীর অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। তবে মুক্তির পর তার শারীরিক অবস্থা, আটকের সময়কার পরিস্থিতি এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসা গুরুত্বপূর্ণ।