সারাবিশ্ব
‘দাঙ্গার’ বয়ানের আড়ালে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকছে ফরাসি সরকার
ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, দোকানপাটে লুটপাট এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় নিন্দা জানানো হলেও, এসব ঘটনাকে সামনে রেখে সরকার আন্দোলনের মূল কারণগুলো আড়াল করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সমালোচকেরা। তাঁদের মতে, জীবনযাত্রার মানের অবনতি, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য এবং শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সংকট থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অথচ এসব সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও দমনমূলক পদক্ষেপের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, সহিংসতার দৃশ্য সামনে এনে সরকার জনমনে ভীতি তৈরি করছে এবং নিজেদের নীতিগত ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁদের মতে, বিশৃঙ্খলার ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে সরকার নিজেকে জনশৃঙ্খলার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরলেও যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তরুণদের ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলেছে, তা মোকাবিলায় যথেষ্ট উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বিক্ষোভের মধ্যে সহিংসতা ঘটলে তার বিচার হওয়া প্রয়োজন, তবে সেই অজুহাতে পুরো আন্দোলনের দাবিকে অগ্রাহ্য করা যায় না। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগ, অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ এবং ব্যাপক আটকের ঘটনাও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন সমালোচকেরা।
পুলিশের বলপ্রয়োগ ও ব্যাপক আটক নিয়ে উদ্বেগ
বিক্ষোভ দমনে পুলিশের অভিযানে বেশ কয়েকজন কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ বছর বয়সী ইডেন পুলিশের নিক্ষেপ করা কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেডের আঘাতে চোয়ালের হাড় ভেঙে ফেলে এবং তার কয়েকটি দাঁত পড়ে যায়। ১৬ বছর বয়সী মায়েল পুলিশের রাবার বুলেট বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, এমন একটি প্রক্ষেপণের আঘাতে এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারায়। অন্যদিকে, ১৫ বছর বয়সী ইভানের হাতে পুলিশের ছোড়া স্টান গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলে তার হাত গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত একটি হাত বিচ্ছিন্ন করতে হয়। এসব ঘটনা বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যবহৃত কৌশল ও বলপ্রয়োগের মাত্রা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার ৯৫০ জনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। আটক ব্যক্তিদের ৮৫ শতাংশই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক। এরপর ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের ঘটনায় আরও ২ হাজার ৭০০ জনকে আটক করা হয়। পরদিন পুলিশ আরও প্রায় এক হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন, ধারাবাহিক অভিযান এবং ব্যাপক আটকের এই চিত্রকে আন্দোলন দমনে কঠোর রাষ্ট্রীয় অবস্থানের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন সমালোচকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, এ ধরনের পদক্ষেপ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের মধ্যেও ভীতি তৈরি করতে পারে এবং সরকারের সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
দারিদ্র্য ও বৈষম্যে বাড়ছে মানুষের ক্ষোভ
ফ্রান্সের চলমান অস্থিরতার পেছনে তাৎক্ষণিক সংঘর্ষের বাইরেও দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট রয়েছে বলে মনে করছেন আন্দোলনের সমর্থকেরা। তাঁদের মতে, দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, দারিদ্র্যের চাপ তীব্র হয়েছে এবং সম্পদের বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। অথচ রাজনৈতিক আলোচনায় এসব সমস্যার গুরুত্ব অনেক সময় সহিংসতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯০-এর দশকের পর ফ্রান্সে দারিদ্র্যের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটিতে প্রায় ৯৮ লাখ মানুষ সরকারি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফামের তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের ৫৩ জন ধনকুবেরের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ দেশটির প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মোট সম্পদের সমান। সম্পদের এমন অসম বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, দেশের একাংশ বিপুল সম্পদের মালিক হলেও অন্য একটি বড় জনগোষ্ঠী মৌলিক চাহিদা পূরণ, মানসম্মত শিক্ষা এবং উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই বৈষম্য তরুণদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ানোর অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়েছে শিক্ষাব্যবস্থাতেও। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অবকাঠামোগত দুরবস্থা, শিক্ষকসংকট এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে ভুগছে। ফলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তুলনামূলকভাবে অনুন্নত পরিবেশে পড়াশোনা করতে বাধ্য হচ্ছে। আন্দোলনের সমর্থকদের মতে, শিক্ষার সুযোগে এই বৈষম্য শুধু বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষাজীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নতির ক্ষেত্রেও অসমতা বাড়িয়ে তুলছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত সংকট, দুর্ভোগে শিক্ষার্থীরা
ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডের বাইরে মায়োত দ্বীপের আকুয়া এলাকায় অবস্থিত সিতে দ্য নর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গত ৩১ আগস্ট থেকে অবরোধ শুরু হয়। প্যারিস অঞ্চলের বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক মনোযোগ পাওয়ার অনেক আগেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক-কর্মীরা উন্নত শিক্ষার পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে প্রতিবাদে নামেন। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৯০০ শিক্ষার্থীর জন্য নির্মিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থীকে গাদাগাদি করে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নেই। এর পাশাপাশি শিক্ষকসংকট, পানির সরবরাহে বিঘ্ন এবং শৌচাগারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি দুর্ভোগ তৈরি করেছে। প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্যারিসের উপকণ্ঠের সেভরঁ এলাকার ব্লেজ-সঁদ্রার মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সমস্যা চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা ভবনের ছাদ ও দেয়াল দিয়ে পানি চুইয়ে পড়া, ছত্রাকের বিস্তার, ব্যবহার অনুপযোগী শৌচাগার এবং পর্যাপ্ত টেবিল-চেয়ারের অভাব নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছেন। এসব সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য, স্বাচ্ছন্দ্য ও পাঠদানের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
একই অঞ্চলের পাঁতাঁ এলাকার মার্সেলাঁ-বের্তলো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জানালাগুলো আর খোলা যায় না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ তাপপ্রবাহের সময় বিদ্যালয়টির ভেতরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। গরমের মধ্যে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রেণিকক্ষে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা কষ্টকর হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, প্যারিসের উপকণ্ঠের বাগনোল এলাকার পলিতজে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জানতে পারেন, বিদ্যালয়ের পানীয় জল নিরাপদ নয়। অথচ এর আগের জুন মাসেই পানির নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল।
এসব ঘটনা ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত অবনতির চিত্র তুলে ধরে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ আরও নাজুক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন সংকট শুধু অবকাঠামোগত দুর্বলতার বিষয় নয়; এটি সরকারি বিনিয়োগ, সম্পদের বণ্টন এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের বিষয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
এক শিক্ষাবর্ষে বাদ পড়েছে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ শিক্ষণঘণ্টা
অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি ফ্রান্সের সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদানেও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে মায়োতকে বাদ দিয়ে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ শিক্ষণঘণ্টা অনুষ্ঠিত হয়নি। নির্ধারিত মোট শিক্ষণঘণ্টার প্রায় ১০ শতাংশ এভাবে বাদ পড়ে। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ শিক্ষণঘণ্টা নষ্ট হয়েছে অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ার কারণে।
শিক্ষণঘণ্টার এই ঘাটতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যক্রম শেষ করতে না পারা, পরীক্ষার প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়া এবং শিক্ষার মানে বৈষম্য তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষে ব্যক্তিগত শিক্ষক বা অতিরিক্ত শিক্ষাসহায়তার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়, তারা এ ধরনের ঘাটতির কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফরাসি অর্থনীতিবিদ লুকাস শানসেলের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ক্ষমতায় আসার পর থেকে শিক্ষার্থীপ্রতি সরকারি ব্যয় ২০ শতাংশ কমেছে। এই হিসাব শিক্ষাখাতে সরকারি বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নিয়ে বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, শিক্ষকসংকট দূর করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তাঁদের মতে, এসব দাবি উপেক্ষা করে কেবল বিক্ষোভ দমনে মনোযোগী হলে সংকটের মূল কারণ দূর হবে না।
ম্যাক্রোঁর নিরাপত্তানির্ভর পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বোঝার কথা বললেও আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সমাধানের আশ্বাস দিতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে সমালোচনা করা হয়েছে। শুক্রবার ২০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন ও শিক্ষার্থী নির্বাচনসংক্রান্ত প্ল্যাটফর্ম সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবে শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক সংকট, অবকাঠামোগত দুরবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের অন্যান্য প্রধান দাবি পূরণে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, বিক্ষোভ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছেন ম্যাক্রোঁ। তিনি ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছেন এবং বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার অঙ্গীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, ‘চরম বামপন্থীরা’ প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করতে চাইছে। সরকারের এমন বক্তব্য ও পদক্ষেপের ফলে আন্দোলনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাবিগুলোর পরিবর্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতিই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসছে বলে মনে করছেন সমালোচকেরা।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও বামপন্থীদের ‘একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে প্রজাতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে পুলিশের প্রতি সমর্থনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এবং অন্যদিকে দাঙ্গাকারীদের সহিংস কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পার্থক্য আড়াল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে সরকারের নীতির সমালোচনা করলেই কেউ রাষ্ট্রবিরোধী বা সহিংসতার সমর্থক-এমন ধারণা তৈরি হতে পারে। এতে গণতান্ত্রিক সমাজে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
সহিংসতাকে কেন্দ্র করে সক্রিয় চরম ডানপন্থীরা
ফ্রান্সের অস্থির পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশটির চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও সম্ভাব্য অভিবাসী পটভূমির ওপর জোর দিয়ে তারা বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্ককে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করছে। চরম ডানপন্থী কয়েকজন রাজনীতিক বিদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের ‘দুষ্কৃতকারীদের দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যরা নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সমালোচকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার পরিবর্তে পুরো অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে এসব বক্তব্য ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক শিবিরকেও পরোক্ষভাবে সুবিধা দিচ্ছে বলে তাঁদের ধারণা। কারণ, এর মাধ্যমে সরকার নিজেকে চরম ডানপন্থীদের উত্থানের বিরুদ্ধে প্রধান প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতির সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে নিরাপত্তা, অভিবাসন ও জনমনে ভীতির বিষয়গুলো রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসছে।
এতে ভোটারদের সামনে রাজনৈতিক বিকল্পও ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সমালোচকেরা। একদিকে এমন সরকারি নীতির সমালোচনা রয়েছে, যেগুলো মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে; অন্যদিকে সেই ক্ষোভকে জাতিগত বিদ্বেষ ও অভিবাসীবিরোধী মনোভাবের দিকে পরিচালিত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁদের মতে, এ পরিস্থিতিতে প্রকৃত সমস্যাগুলোর সমাধানের বদলে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্দোলন থামলেও নতুন বিক্ষোভের আশঙ্কা
সমালোচকদের মতে, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি স্পষ্ট। কারণ, এসব দাবি পূরণ করতে হলে ম্যাক্রোঁ সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে ধনীদের সম্পদ ও স্বার্থ সুরক্ষার অভিযোগের বিপরীতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন, শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ এবং সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলোকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠবে।
তাঁদের আশঙ্কা, সরকার হয়তো আন্দোলনকে দীর্ঘায়িত হতে দিয়ে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ার অপেক্ষা করবে। ভয়ভীতি, সহিংসতার বিতর্ক কিংবা জনসমর্থন হারানোর আশঙ্কার মধ্য দিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্লান্তি তৈরি হলে বিক্ষোভ এমনিতেই স্তিমিত হয়ে যেতে পারে-সরকার এমন পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে বলে মনে করছেন সমালোচকেরা। তবে তাঁদের মতে, আন্দোলন সাময়িকভাবে থেমে গেলেও এর পেছনের সমস্যাগুলো থেকে যাবে। জীবনযাত্রার ব্যয়, দারিদ্র্য, সম্পদের বৈষম্য, শিক্ষকসংকট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুরবস্থা দূর করা না হলে ভবিষ্যতে নতুন করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ফ্রান্সের চলমান অস্থিরতা তাই কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সামাজিক বৈষম্য, সরকারি জনসেবা খাতের অবনতি, শিক্ষার সুযোগে অসমতা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। সহিংসতার ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুলিশের বলপ্রয়োগের অভিযোগ তদন্ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকসংকট নিরসন এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি ছাড়া কেবল কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে জনঅসন্তোষ দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।