সারাদেশ
মাছের তীব্র সংকটে ধুঁকছে ভাঙ্গুড়ার ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্প, বন্ধ অধিকাংশ চাতাল
একসময় দেশি মাছে সমৃদ্ধ ছিল পাবনার চলনবিল অধ্যুষিত ভাঙ্গুড়া উপজেলা। বর্ষা মৌসুম শেষে নদী, খাল ও বিল থেকে প্রচুর মাছ আহরণের পরপরই কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠত এলাকার শুঁটকি চাতালগুলো। মাছ পরিষ্কার করা, মাচায় শুকানো ও শুঁটকি তৈরির কাজে দিনভর ব্যস্ত সময় পার করতেন শত শত শ্রমিক। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ভাঙ্গুড়ায় উৎপাদিত শুঁটকি রপ্তানি হতো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। দেশি মাছের তীব্র সংকট, জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া এবং নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহারে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে ভাঙ্গুড়ার ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্প।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চলনবিল অধ্যুষিত ভাঙ্গুড়া এলাকার অধিকাংশ শুঁটকি চাতাল এখন বন্ধ। হাতে গোনা কয়েকটি চাতাল চালু থাকলেও সেখানে উৎপাদন হচ্ছে সীমিত পরিসরে। মাছের অভাবে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে কাজ হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকেরা। একসময় যেখানে মাছ শুকানো ও শুঁটকি তৈরির ব্যস্ততায় দিন কাটত, সেখানে এখন বিরাজ করছে নীরবতা। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেক পরিবারের জীবিকা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
সম্প্রতি উপজেলার কলকতি এলাকার একটি শুঁটকি চাতালে গিয়ে দেখা যায়, অল্প কিছু মাছ নিয়ে কাজ করছেন কয়েকজন শ্রমিক। চাতালের বিস্তীর্ণ অংশ পড়ে রয়েছে প্রায় ফাঁকা। মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক সময়ের মতো উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারছেন না মালিকেরা। চাতালের মালিক মো. দুলাল হোসেন জানান, একসময় দিলপাশার, পুইবিল, আদাবাড়িয়া, বাঁশবাড়িয়া ও দত্তখারুয়া বিলে প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে সেই মাছের প্রাচুর্য আর নেই। তাঁর অভিযোগ, চায়না দুয়ারি জালে মা মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নির্বিচারে ধরা হচ্ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে দেশি মাছের উৎপাদন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শুঁটকি শিল্পে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় চলনবিলের মুক্ত জলাশয়গুলো ছিল দেশি মাছের অন্যতম সমৃদ্ধ আধার। মাগুর, চাপিলা, শিং, পাবদা, টাকি, চিতল, রিটা, আইড়, কই, বোয়াল, খলসে, দেশি সরপুঁটি, গজার, বাইম, টেংরা, মলা ও শোলসহ নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত এসব জলাশয়ে। বর্ষা মৌসুমে মাছের প্রাচুর্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল শুঁটকি উৎপাদন ও বিপণনের বিস্তৃত কার্যক্রম। স্থানীয়দের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এ অঞ্চলের শুঁটকি অন্তত ২০টি দেশে রপ্তানি হতো বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু জলাশয়ে পানির পরিমাণ কমে যাওয়া, মাছের প্রাপ্যতা হ্রাস এবং মাছ ধরার অনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতির কারণে সেই সম্ভাবনাময় ব্যবসা এখন প্রায় ধ্বংসের মুখে।
মাছের সংকট এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে অনেক ব্যবসায়ীকে টানা দুই সপ্তাহ পর্যন্ত চাতাল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন বন্ধ থাকার পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া এবং ব্যবসার অন্যান্য খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। চাতাল ব্যবসায়ী আবুল হোসেন জানান, চলনবিল এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন, অবৈধ জালের ব্যবহার এবং নির্বিচারে মাছ শিকারের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী শুঁটকি উৎপাদন করতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে অনেক ব্যবসায়ীকে স্থায়ীভাবে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুঁটকি উৎপাদন কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এ শিল্পের শ্রমিকেরা। মাছ পরিষ্কার করা, কাটা, ধোয়া, মাচায় ছড়িয়ে দেওয়া এবং শুকনো মাছ সংগ্রহের মতো বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন স্থানীয় অনেক নারী-পুরুষ। চাতালগুলো সচল থাকলে প্রতিদিন কাজের সুযোগ মিলত তাঁদের। কিন্তু বর্তমানে মাছের অভাবে নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন না অনেকেই। ফলে দৈনন্দিন আয় কমে যাওয়ায় সংসারের খাবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
শ্রমিক লাইলী খাতুন বলেন, আগে প্রতিদিন কাজ করে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় করতে পারতেন। সেই আয় দিয়েই সংসারের খরচ চালাতে সহায়তা করতেন তিনি। কিন্তু এখন মাছ না থাকায় অধিকাংশ দিন কাজ মেলে না। কখনো কাজ পেলেও তা দিয়ে সংসারের সব প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয় না। এভাবে চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মাছের সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। নদী, খাল ও বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির ফলে জলাশয়ের পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া এবং বৃষ্টিপাতের ঘাটতি মাছের আবাসস্থলকে সংকুচিত করছে। এর পাশাপাশি চায়না দুয়ারি ও বাদাই জালের মতো ক্ষতিকর জালের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এসব জালে বড় মাছের পাশাপাশি মা মাছ, রেণু ও পোনা মাছও ধরা পড়ছে। ফলে মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে জলাশয়ে পানির পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে নির্বিচারে মাছ আহরণের কারণে দেশি মাছের স্বাভাবিক উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়ছে।
এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম মোল্লা বলেন, চায়না দুয়ারিসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ জালের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছ শিকার এবং বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় জলাশয়ে পানির পরিমাণ ও মাছের প্রাপ্যতা-দুটিই কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে শুঁটকি উৎপাদনের ওপর। গত বছর উপজেলায় তিনটি শুঁটকি চাতাল চালু থাকলেও চলতি বছর মাত্র একটি চাতাল টিকে আছে। গত বছর সাত টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। কিন্তু এবার চার থেকে পাঁচ টন উৎপাদন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মাছের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মৎস্যসম্পদ রক্ষায় উপজেলা মৎস্য বিভাগের উদ্যোগের কথা জানিয়ে আরিফুল ইসলাম মোল্লা আরও বলেন, চলতি বছর নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে ১৬টি অভিযান পরিচালনা করে ৭০৩টি চায়না দুয়ারি জাল ধ্বংস করা হয়েছে। দেশি মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালানোর পাশাপাশি জলাশয় সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পেতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভাঙ্গুড়ার শুঁটকি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রথমেই দেশি মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ করতে হবে। নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে কঠোর নজরদারি, নদী-খাল-বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা, জলাশয় ভরাট ও অপরিকল্পিত প্রতিবন্ধকতা রোধ এবং মাছের প্রজনন মৌসুমে আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় জেলে, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পই নয়, এর সঙ্গে জড়িত বহু মানুষের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একসময় যে শুঁটকি শিল্প ভাঙ্গুড়ার পরিচিতি বহন করত, যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে তা একদিন ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।