জাতীয়
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘স্টেজ-সি’র পরীক্ষা শুরু
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি আরও এক ধাপ এগিয়েছে। ইউনিটটির বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরীক্ষার বিস্তারিত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদন এবং কমিশনিংয়ের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ইউনিটটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘স্টেজ-সি’ ও ‘পাওয়ার স্টার্টআপ’ কার্যক্রমে এগিয়ে যাবে। এরই মধ্যে রোববার থেকে স্টেজ-সি পর্যায়ের ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্টেজ-সি পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও পরিচালনব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। এসব পরীক্ষার মূল লক্ষ্য হলো কেন্দ্রটির নিরাপদ, স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য পরিচালনা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি, বিভিন্ন কারিগরি ব্যবস্থা নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাজ করছে কি না এবং জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কেন্দ্রটি কতটা প্রস্তুত, তা যাচাই করা হবে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, স্টেজ-সি পর্যায়ে রিঅ্যাক্টর, প্রাথমিক ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কুলিং সিস্টেম, টারবাইন-জেনারেটর, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, আধুনিক যন্ত্রপাতি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সার্বিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হবে। এ সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার পাশাপাশি সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তাও যাচাই করা হবে।
তিনি আরও জানান, রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে টারবাইনের নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাব্যবস্থা, জেনারেটর এবং সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক অবকাঠামোর কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। স্বাভাবিক পরিচালন পরিস্থিতিতে এসব যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করাই এ পরীক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। কোনো ধরনের ত্রুটি বা অসংগতি দেখা দিলে তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও কমিশনিং প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্টেজ-সি পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা। এ পর্যায়ে গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, নিয়ন্ত্রণ, সুরক্ষা এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সাব-সিস্টেমের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। কেন্দ্রটির নিরাপদ পরিচালনা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে এসব পরীক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন করা, কমিশনিং-সংক্রান্ত সব শর্ত পূরণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়ার পর প্রথম ইউনিটটিকে পরবর্তী ‘পাইলট অপারেশন’ বা পরীক্ষামূলক উৎপাদন পর্যায়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি ধাপের ফলাফল পর্যালোচনা করে পরবর্তী কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ, স্টেজ-সি পরীক্ষার শুরু মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন বা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ তাৎক্ষণিকভাবে শুরু হয়ে যাওয়া নয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্টেজ-সি পর্যায়ে প্রবেশ, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু, পরীক্ষামূলক উৎপাদন এবং পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদন-প্রতিটি আলাদা মাইলফলক। বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা, কমিশনিং কার্যক্রম এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সব শর্ত পূরণ করতে হবে। তাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের স্টেজ-সি পরীক্ষা শুরু হওয়াকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন ও পরবর্তী ধাপগুলোর সফল সমাপ্তির ওপরই নির্ভর করবে কেন্দ্রটির পরীক্ষামূলক এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার সময়সূচি।