সারাদেশ

ফুটপাতে চিতই পিঠা বিক্রি করেই বছরে ১০ লাখ টাকা আয় কাদেরের


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৭ পিএম

ফুটপাতে চিতই পিঠা বিক্রি করেই বছরে ১০ লাখ টাকা আয় কাদেরের
ছবি: সংগৃহীত

মানিকগঞ্জে ফুটপাতে চিতই পিঠা বিক্রি করে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়েছেন আব্দুল কাদের। একসময় অভাব-অনটনে দিন কাটলেও বর্তমানে পিঠা বিক্রির আয়েই তিনি গড়েছেন পাকা বাড়ি, কিনেছেন জমি। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানিকগঞ্জ বাজার ব্রিজের উত্তর পাশে ফুটপাতে পিঠা বিক্রি করছেন তিনি। শীত মৌসুমে ক্রেতাদের ভিড় বাড়লেও সারা বছরই তার দোকানে পিঠা বিক্রি হয়। পরিশ্রম আর সততার মাধ্যমে গড়ে তোলা এই ব্যবসা থেকে বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় করছেন বলে জানিয়েছেন কাদের।

একসময় অভাব-অনটন ছিল কাদেরের নিত্যসঙ্গী। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার গোকুলনগর গ্রামে তার সংসার চলত নানা সংকটের মধ্য দিয়ে। পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন আনতে ২০০৯ সালে মানিকগঞ্জ শহরে চিতই পিঠা বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন তিনি। শুরুতে ক্রেতা কম থাকলেও ধীরে ধীরে তার পিঠার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে তার দোকানে পিঠা কিনতে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে তার দোকানে পিঠা খেতে ও পরিবারের জন্য কিনে নিতে আসেন।

নিজের ব্যবসা ও আয়ের বিষয়ে আব্দুল কাদের বলেন, শীত মৌসুমে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার পিঠা বিক্রি হয়। বছরের অন্যান্য সময়ে দৈনিক বিক্রি থাকে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকার মধ্যে। খরচ বাদ দিয়ে শীত মৌসুমে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় হয়। সব মিলিয়ে মাসে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন তিনি। সেই হিসাবে বছরে তার আয় প্রায় ১০ লাখ টাকা।

কাদেরের দোকানে দুই ধরনের চিতই পিঠা পাওয়া যায়। সাধারণ চিতই পিঠার দাম ১০ টাকা এবং ডিম পিঠার দাম ৩০ টাকা। তুলনামূলক কম দামে পিঠা পাওয়া যাওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার দোকানে ভিড় করেন। পিঠা বিক্রির আয় দিয়েই মানিকগঞ্জ পৌর এলাকায় জমি কিনে পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি। দুই মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, আর ছোট মেয়ে বর্তমানে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুরের পর থেকেই কাদেরের দোকানে ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। কেউ বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে বসে গরম গরম চিতই পিঠা খাচ্ছেন, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের জন্য পিঠা পার্সেল করে নিয়ে যাচ্ছেন। পছন্দের পিঠা পেতে অনেককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতেও দেখা যায়। ক্রেতাদের চাহিদা সামাল দিতে স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে পিঠা তৈরি ও বিক্রির কাজ করেন। পিঠার সঙ্গে পরিবেশন করা হয় তিন ধরনের ভর্তা, যা ক্রেতাদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে।

কাদেরের দোকানের পিঠার মান ও পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্ট স্থানীয়রাও। পাশের চায়ের দোকানদার লিটন মিয়া বলেন, এলাকায় যতগুলো পিঠার দোকান রয়েছে, তার মধ্যে কাদেরের পিঠার মান ভালো। তিনি চালের গুঁড়ার সঙ্গে শুধু লবণপানি মিশিয়ে চিতই পিঠা তৈরি করেন। পিঠা তৈরিতে কোনো ভেজাল দেওয়া হয় না এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা হয়। এ কারণে তারা নিয়মিত কাদেরের দোকান থেকে পিঠা কেনেন।

দীর্ঘদিনের ক্রেতা ব্যাংক কর্মকর্তা শরিফ হোসেন বলেন, তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে এই দোকান থেকে পিঠা কিনছেন। শুরুতে প্রতিটি পিঠার দাম ছিল দুই টাকা। পরে দাম বেড়ে পাঁচ টাকা হয়, আর বর্তমানে সাধারণ পিঠা বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকায়। অন্যান্য জিনিসের দাম বিবেচনায় নিলে পিঠার এই দাম তুলনামূলকভাবে কম বলেও মনে করেন তিনি।

মানিকগঞ্জের ফুটপাতের এই ছোট্ট পিঠার দোকান কেবল কাদেরের জীবিকার মাধ্যম নয়, তার পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনেরও বড় অবলম্বন। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, ক্রেতাদের আস্থা এবং পণ্যের মান ধরে রাখার মধ্য দিয়ে তিনি ব্যবসাটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কাদেরের মতো অনেকেই ফুটপাতে পিঠা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের কাছে এই ক্ষুদ্র ব্যবসাই পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার অন্যতম ভরসা।